শিক্ষার্থীরা বলছেন, জাকসু নির্বাচনে শিবিরের জয়ের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নিজস্ব ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক পরিচিতি ও দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার অনুপস্থিতি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করার পর থেকে কর্মসূচিতে নারী নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে তাদের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তিই ছিল জয়ের প্রধান নিয়ামক।
ছাত্রশিবির সম্পর্কে কবির হত্যাকাণ্ড নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, নারীদের নিরাপত্তা ও পোশাকের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার শঙ্কার বিষয়টিকে বিবেচনায় নেয় সংগঠনটি। নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব ধারণা ও শঙ্কার বিষয়গুলো দূর করতে কাজ করে তারা। ক্যাম্পাসে আয়োজন করে হেলথ ক্যাম্প। ওই কর্মসূচিতে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ নারী স্বেচ্ছাসেবী রাখা হয়। এ ছাড়া জাকসু নির্বাচনে সমন্বিত শিক্ষার্থী প্যানেলে ছয় নারী প্রার্থী রাখা হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও প্রার্থী করা হয়।
নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বিজয়ী ছাত্রশিবিরের বর্তমান কমিটির দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৩ হাজার ৯৩০ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের আবু তৌহিদ মো. সিয়াম পেয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ ভোট। মাজহারুল বিএনসিসির বিশ্ববিদ্যালয় প্লাটুনের সার্জেন্ট, ক্যাডেট আন্ডার অফিসার (সিইউও) ও ইনচার্জ ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বিতর্ক সংগঠন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট অর্গানাইজেশন (জেইউডিও) ও জাবি প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন।
এজিএস (পুরুষ) ফেরদৌস আল হাসান পেয়েছেন ২ হাজার ৩৫৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের জিয়া উদ্দিন আয়ান পেয়েছেন ২ হাজার ১৪ ভোট। ফেরদৌস রোভার স্কাউটের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র রোভার মেট। এজিএস (নারী) আয়েশা সিদ্দিকা (মেঘলা) পেয়েছেন ৩ হাজার ৪০২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের মালিহা নামলাহ পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ ভোট। মেঘলা জাবি প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের সদস্য। এ ছাড়া নির্বাচনে শিবিরের প্যানেলে প্রার্থীদের অধিকাংশ একাধিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাঁদের নিজস্ব ভোটব্যাংক ছিল।
ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাধারণ সম্পাদক (জিএস), এজিএস (পুরুষ) ও এজিএস (নারী) পদের বাইরে শিবিরের প্যানেলে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে দেড় হাজারের ওপরে ভোট পেয়েছেন ছয়জন, দুই হাজারের ওপরে ভোট পেয়েছেন পাঁচজন, আড়াই হাজারের ওপরে ভোট পেয়েছেন চারজন ও তিন হাজারের ওপরে ভোট পেয়েছেন দুজন। এদিক থেকে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের দেড় হাজারের ওপরে ‘ভোটব্যাংক’ আছে।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফারহানা রহমান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শিবির সক্রিয় হওয়ার পর তাদের কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়াতে দেখিনি। এ কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী তাদের ভোট দিয়েছেন। শিবির যদি নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলে, তাহলে কারও কোনো সমস্যা নেই। আর তারা তো ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে জাকসু নির্বাচনে যাঁরা জয়ী হয়েছেন, তাঁরা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবেন, এটাই প্রত্যাশা থাকবে।’
সদ্য নির্বাচিত জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের যে বিজয়, সে বিজয় আমাদের নয়, এটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর বিজয়। আমরা মনে করি, এটাই চূড়ান্ত বিজয় নয়, আমরা তখনই বিজয় অর্জন করব, যেদিন এই জাকসুর দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী জাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারব। সেদিন যদি শিক্ষার্থীরা স্বীকৃতি দেন, আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি, আমানত রক্ষা করতে পেরেছি, সেই দিন আমরা বলব, আমরা বিজয় অর্জন করেছি।’

One Reply to “জাকসু নির্বাচনে শিবিরের জয়ের প্রধান নিয়ামক ইতিবাচক ভাবমূর্তি, আছে আরও অনেক কারণ”
Comments are closed.