জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান জেলা সনাতন পার্টির

আজ ১১ মে সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৯৪৭-২০২৬ সময়কালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধারাবাহিকতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে “সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন” প্রণয়নের আবেদন এবং ৮ দফা দাবি আন্দোলনে মিথ্যা মামলায় সকল কারাবন্দির মুক্তি দাবিতে স্মারকলিপি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবীরের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করে বাংলাদেশ সনাতন পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ।
স্মারকলিপি উল্লিখিত বিসয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- কেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন অতিব জরুরী। সেই বিষয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো-
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (১৯৪৭-১৯৭১):
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষত হিন্দুদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন, সম্পত্তি দখল এবং জোরপূর্বক দেশত্যাগের প্রবণতা শুরু হয়।
১৯৬৪ সালের দাঙ্গা এবং পরবর্তীতে “শত্রু সম্পত্তি আইন” সংখ্যালঘুদের ভূমি ও সম্পত্তি হারানোর একটি বড় কারণ হয়ে দাঁডায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে টার্গেটেড নির্যাতনের শিকার হয় যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি গুরুতর অধ্যায়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতা (১৯৭২-২০০৫):
স্বাধীনতার পর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সংখ্যালঘু নির্যাতন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকে।
গবেষণায় দেখা যায়-
(ক) ১৯৬৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ১ কোটিরও বেশি সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছে।
(খ) গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০-৭০০ জন সংখ্যালঘু দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের-
অনুচ্ছেদ ২৭: সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা;
অনুচ্ছেদ ২৮: ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদির ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ
অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২: জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের আশ্রয়ের অধিকার;
অনুচ্ছেদ ৪১: ধর্মীয় স্বাধীনতা;
উপরোক্ত মৌলিক অধিকারসমূহ বাস্তবায়নে রাষ্ট্র বাধ্যবাধকতার অধীন।
এছাড়া বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার সনদ (টউঐজ) ও অন্যান্য চুক্তির প্রতিও অঙ্গীকারবদ্ধ।
তথাপি বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, বিদ্যমান আইন সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় যথেষ্ট কার্যকর নয় এবং একটি বিশেষায়িত আইনের অভাব রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা (২০২৬):
* সংখ্যালঘুরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
* সংগঠিতভাবে হামলা ও সম্পত্তি দখলের ঘটনা ঘটছে;
* অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান;
* ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে ব্যর্থ হচ্ছে,
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিসংখ্যান (২০০৫-২০২৫)।
(ক) সাম্প্রতিক (২০২৪-২০২৫) চিত্র ২০২৪ আগস্ট-২০২৫ জুন পর্যন্ত।
(খ) ২,৪৪২টি হামলার ঘটনা (হত্যা, ধর্ষণ, মন্দির ভাঙচুর, লুটপাটসহ) ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে।
(গ) ২৫৮টি নির্যাতনের ঘটনা।
(ঘ) ২০টি ধর্ষণ, ৫৯টি উপাসনালয়ে হামলা ২০২৫ (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর)।
(ঙ) ১৬০টি হামলা, যার মধ্যে ৬০টি মূর্তি ভাঙচুর ২০২৫ সালে মোট।
(চ) প্রায়- ৬৪৫টি হামলার অভিযোগ (সরকারি তথ্য অনুযায়ী) ২০২৪-২০২৫ সময়কালে।
(ছ) সহিংসতায় ২০০+ মানুষ নিহত (রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘুরাও আক্রান্ত)।

২০২০-২০২৪ রিপোর্ট (একটি বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী)
১,০৪৫টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা (২০২৩-২০২৪ )

আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে-
(ক) বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা “গুরুতর সমস্যা” হিসেবে বিদ্যমান
(খ) পূর্ববর্তী বছরগুলোর প্রবণতা (২০১০-২০২০) ২০১৬ সালের প্রথম ৬ মাসে।
(গ) ৬৬টি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া।
(ঘ) ৪৯টি মন্দির/ মঠ ভাঙচুর।
(ঙ) ২৪ জন আহত।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে-
(ক) সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা “প্রায় দৈনন্দিন ঘটনা”।
(খ) দীর্ঘমেয়াদি (২০ বছরের ট্রেন্ড) গবেষণায় দেখা গেছে।
(গ) জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩৬.৬% সংখ্যালঘু সরাসরি নির্যাতনের শিকার মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী
(ঘ) প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) হিন্দু দেশত্যাগ করেছে (১৯৬৪ বর্তমান)
(ঙ) গড়ে প্রতিদিন ৬৩২ জন হিন্দু দেশ ছাড়ে।
সংখ্যালঘুদের বর্তমান অবস্থা :-
(ক) ভূমি দখল, সামাজিক বৈষম্য ও সহিংসতা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা।
(খ) ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা; (গ) জমি দখল ও উচ্ছেদ; (ঘ) নারী নির্যাতন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তর;
(ঙ) রাজনৈতিক সহিংসতায় টার্গেট করা; (চ) গ্রামাঞ্চলে সংগঠিত হামলা ও লুটপাট;
(জ) অনেক ক্ষেত্রে এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য থাকে সম্পত্তি দখল;
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলী, আপনার নিকট উপস্থাপন করা হলো ঃ-
১। ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ইং কক্সাবাজারের নয়ন সাধু হত্যা;
২। ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ইং কুমিল্লা কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা;
৩। ৩ জানুয়ারী, ২০২৬ ইং খোকন চন্দ্র দাস হত্যা:
৪। ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং ময়মনসিংহ ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যা;
৫। ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ইং সাতক্ষীরায় বিথীকা সাধু হত্যা:
৬। ০৩ মে, ২০২৬ ইং পশু চিকিৎসক অপহরণ:
৭। ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ফরিদপুর রঞ্জিত সরকার হত্যা;
৮। টাঙ্গাইলে একজন গর্ভবতী বোনকে ধর্ষণ ও হত্যা;
৯। কক্সবাজারে গনেশ পাল হত্যা;
১০। খুলনায় পুলিশ কর্মকর্তার মা ভারতী মন্ডলকে গলা কেটে হত্যা;
প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি দখল, মঠ-মন্দির ভাংচুর, চাঁদাবাজি, অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, গুম, খুন, হত্যা চলছে।
এমতাবস্থায় দৃঢ় দাবিসমূহ নিম্নরূপ:
১. সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় একটি পৃথক ও কার্যকর “সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন” দ্রুত প্রণয়ন করা হোক;
২. সংখ্যালঘু নির্যাতনের মামলাসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক;
৩. সংখ্যালঘুদের ভূমি ও সম্পত্তি রক্ষায় কঠোর ও বিশেষায়িত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক;
৪. ক্ষতিগস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক;
৫. ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা জোরদার ও স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক;
৬. সংখ্যালঘু বিষয়ক একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক কমিশন গঠন করা হোক;
৭. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক।

স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন সনাতন পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি টনি মল্লিক,সিনিয়র সহ-সভাপতি উত্তম সূত্রধর,সহ-সভাপতি মন্তুস সরকার, সহ-সাধারণ সম্পাদক শ্রীরুপ সরকার, আশুতোষ ঘোষ, কোষাধ্যক্ষ অজয় রায়, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট কাঞ্চনসহ অন্যান্যরা।