বাংলাদেশের শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ রাস্তার ধারের মুখরোচক খাবার বা স্ট্রিট ফুড। সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় চটপটি, ফুচকা কিংবা আখের রসের প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষণ চিরকালই বেশি। তবে এই স্বাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে মৃত্যুঝুঁকি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের স্ট্রিট ফুড এখন প্রাণঘাতী জীবাণুর আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও আইসিডিডিআর,বি-র দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণার কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান হলো:
রাজধানীর প্রায় ৯০ শতাংশ স্ট্রিট ফুডই অনিরাপদ। ৫৫ শতাংশ খাবারে সরাসরি ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি মিলেছে।
৮৮ শতাংশ বিক্রেতার হাতেই পাওয়া গেছে অস্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাবারে মানুষের মল ও দূষিত পানি থেকে আসা ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ভিব্রিও-র মতো ব্যাকটেরিয়া আশঙ্কাজনক হারে উপস্থিত। ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষায় নির্দিষ্ট কিছু খাবারে জীবাণুর যে পরিমাণ পাওয়া গেছে তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো:চটপটি: প্রতি প্লেটে ৭২ মিলিয়ন ই-কোলাই এবং ৭৫০টি সালমোনেলা।
আখের জুস: প্রতি গ্লাসে ৬৫,০০০ ই-কোলাই এবং ১৭,০০০ সালমোনেলা।
ছোলা মুড়ি: প্রতি প্লেটে ৭,৪০,০০০ ই-কোলাই ও ৩ মিলিয়ন ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া।
স্যান্ডউইচ: প্রতিটিতে ২,০০০ ই-কোলাই এবং ১.৬ মিলিয়ন ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া।
বিশেষজ্ঞরা এই ভয়াবহ অবস্থার জন্য মূলত বিক্রেতাদের অসচেতনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে দায়ী করেছেন। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেঅপরিষ্কার পানি ও শিল্প-কারখানার দূষিত বরফ ব্যবহার।
বিক্রেতাদের হাত ধোয়ার অনীহা এবং অপরিচ্ছন্ন পোশাক।
একই পানি দিয়ে বারবার বাসন পরিষ্কার করা।
রাস্তার ধুলোবালি ও মাছির উপদ্রব।
অনিরাপদ এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা দ্রুত ডায়রিয়া, টাইফয়েড, কলেরা এবং হেপাটাইটিস এ ও ই-র মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভার ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।রাস্তার খাবারের এই ভয়াবহতা রোধে কেবল সরকারি নজরদারি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। বিক্রেতাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নিরাপদ পানির জোগান নিশ্চিত করা না গেলে এই ‘স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি’ দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াবে।
