আজকের এই চোখের জল আনন্দের

‘চোখের জল দিয়ে ভাইকে বরণ করেছি, তবে আজকের এই চোখের জল আনন্দের।’ বলছিলেন সাইফুন নাহার।

তিনি ২১ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মতিউর রহমানের (৩৬) ছোট বোন।

সেই মতিউর রহমান গতকাল শুক্রবার ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন। তবে কীভাবে তিনি ভারতে গেলেন, সেই রহস্যের জট খোলেনি।

গতকাল ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন বেলা ২টা ২২ মিনিট।

পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের শূন্যরেখায় ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে হেঁটে হেঁটে বাংলাদেশে এলেন মতিউর।

বাঁধভাঙা আবেগে দৌড়ে গিয়ে মতিউরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা মর্জিনা বেগম ও বোন সাইফুন নাহার।

পেছন থেকে বাবা সহিদুল ইসলামও মতিউরকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

স্বজনদের কান্না দেখে কাঁদলেন মতিউরও। ২১ বছর প্রিয়জনদের আনন্দের কান্না।

২৭ জুন দেশে ফেরার কথা ছিল মতিউরের।

ওই দিন ফিরতে না পেরে ভারতের ফুলবাড়ী সীমান্ত থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।

ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকতে তাঁর অনুমতিপত্রের (এক্সিট পারমিট) প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু সেটি না থাকায় ওই দিন তিনি ফিরতে পারেননি।

সাইফুন নাহার (৩২) বললেন, ‘আমি যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি, ভাইয়া (মতিউর) তখন নবম শ্রেণিতে পড়ত।

তখনই সে হারিয়ে যায়। ২১ বছর পর ভাইয়াকে পেয়ে অন্য রকম খুশি লাগছে।’

এর আগে ২০০২ সালে ১৫ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিলেন মতিউর।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আখানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ দেবীডাঙ্গা গ্রামের সহিদুল ইসলাম ও

মর্জিনা বেগম দম্পতির বড় ছেলে মতিউর।

তাঁর জন্ম ১৯৮৭ সালে।

২০০২ সালে ছেলে হারানোর বিষয়ে ঠাকুরগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন মতিউরের বাবা।

খোঁজ করছিলেন সম্ভাব্য সব জায়গায়, কিন্তু সন্ধান পাননি।

অনেক দিন পর মা-বাবার কাছে এসে ভালো লাগছে।

এখন আমি বাড়ি যেতে চাই। আমার খুব বেশি কিছু মনে নেই
মতিউর রহমান

গতকাল ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে মা মর্জিনা বেগম বলছিলেন,

‘কত বছর পর আমার বুকের হারানো ধন খুঁজে পেলাম।

কলিজাটা ফিরে এল, আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছে।

যারা আমার মানিকটাকে ফেরত দিল, তাদের জন্য সারা জীবন দোয়া করব।’

মতিউর রহমানকে দেশে ফিরিয়ে দিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিল ভারতের শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

মতিউরকে পরিবারের কাছে তুলে দিতে বাংলাদেশে এসেছেন শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের

মানসিক চিকিৎসক সয়োরালি কে কোন্ডইলকার ও সমাজকর্মী নীতিশ শর্মা।

মতিউর বাংলাদেশে প্রবেশের সময় বাংলাবান্ধা অভিবাসন পুলিশ,

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের ফুলবাড়ী ইমিগ্রেশন পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

দেশে ফেরার পর মতিউর রহমান বলেন, ‘অনেক দিন পর মা-বাবার কাছে এসে ভালো লাগছে।

এখন আমি বাড়ি যেতে চাই। আমার খুব বেশি কিছু মনে নেই।’

গতকাল সকালেই মতিউরের মা-বাবা, বোন ও স্বজনেরা বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের শূন্যরেখায় আসেন।

এ সময় তাঁদের সঙ্গে আখানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রোমান বাদশাহ,

একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হুমায়ুন কবীরও আসেন।

মতিউরকে নিয়ে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষে বিকেলে বাড়ির পথে রওনা দেন স্বজনেরা।

তাঁদের সঙ্গে শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকসহ দুই প্রতিনিধিও যান।

শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের সমাজকর্মী নীতিশ শর্মা বলেন,

২০১৯ সালের জুনে ভারতের মহারাষ্ট্রের কারজাত এলাকার রাস্তা থেকে মতিউর রহমানকে তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

পরে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়ার পর জানতে পারেন, তাঁর বাড়ি বাংলাদেশে।

বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে আজ তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরে অনেক আনন্দিত।

গত ২৭ জুন দেশে ফেরার কথা ছিল মতিউরের।

ওই দিন ফিরতে না পেরে ভারতের ফুলবাড়ী সীমান্ত থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।

ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকতে তাঁর অনুমতিপত্রের (এক্সিট পারমিট) প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি না থাকায় ওই দিন তিনি ফিরতে পারেননি।

এনএএন টিভি

Share this news as a Photo Card