কাগজে-কলমে চলছে কোটি টাকার প্রকল্প, কিন্তু মাঠে নেই কোনো কার্যক্রম। নীলফামারীতে শিশুদের কল্যাণে গৃহীত ‘আইসিবিসি’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত এনজিও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
“শিশুরাই রত্ন, করব যত্ন” — স্লোগানেই শেষ যত্ন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পরিচালিত ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড চাইল্ডকেয়ার (ICBC) প্রকল্পের উদ্দেশ্য শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ, যত্ন ও সাঁতার প্রশিক্ষণ। নীলফামারীতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি সংস্থা লোকাল আইডিয়া ফর এমপাওয়ারমেন্ট (লাইফ)।
তবে প্রকল্পটি এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। জেলা শিশু একাডেমি ও একাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এনজিওটির কার্যক্রম প্রায় অচল। অন্যদিকে এনজিও কর্মকর্তারা বলছেন—“ঊর্ধ্বতনদের দাবি পূরণ না করায়” তাদের বিরুদ্ধে এমন প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ–প্রতিআভিযোগে জর্জরিত প্রকল্প এনজিওর উপ-পরিচালক সুভাষচন্দ্র পাল বলেন, একজন ইউএনও আমার কাছে একটি দাবি করেছিলেন। সেটা না দেওয়ায় তিনি নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছেন। জেলা শিশু কর্মকর্তা অর্থ বরাদ্দের প্রত্যয়নে কালক্ষেপণ করেন—এটাই প্রকৃত সমস্যা।”
প্রকল্পের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. মাদুল মিয়া জানান, “আমরা মাঠে দায়িত্ব পালন করি, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।” কাগজে যত্ন কেন্দ্র, মাঠে নেই অস্তিত্ব প্রকল্প অনুযায়ী জেলার ডিমলা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলায় ৫০০টি শিশু যত্ন কেন্দ্র এবং ৫০টি সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকার কথা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বেশিরভাগ কেন্দ্রের অস্তিত্ব নেই।
কামারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “এই প্রকল্প সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। কোনো এনজিও কখনো আমার কাছে আসেনি।” অথচ নিয়ম অনুযায়ী তিনি ওই এলাকার গ্রাম ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রকল্পের তথ্য জানার কথা। “সমন্বয় সভায় কখনো দেখা যায়নি এনজিওর প্রতিনিধি”
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রীতম সাহা জানান, “প্রতিমাসে এনজিও সমন্বয় সভা হয়। কিন্তু কখনো ‘লাইভ’ এনজিওর প্রতিনিধিকে উপস্থিত পাইনি।” তিনি উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হয়েও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। অর্থ লেনদেন, অনৈতিক সম্পর্ক ও বেতন বঞ্চনা প্রকল্পে কর্মরতদের অভিযোগ—বেতন অনিয়ম, পদায়নে অর্থ লেনদেন এমনকি অনৈতিক সম্পর্কের ঘটনাও ঘটছে।

সৈয়দপুর উপজেলা ইসিসিডি অফিসের শাহিনা বেগম বলেন, “২০২৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই উপপরিচালক সুভাষচন্দ্র পাল আমাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। রাজি না হওয়ায় আমাকে ৯ মাসের বেতন না দিয়েই চাকরি থেকে বাদ দেন।”
স্থানীয় বিউটি বেগম জানান, “আমার বাড়িতে একটি শিশু যত্ন কেন্দ্র ছিল, কিন্তু যত্নকারীদের বেতন না হওয়ায় তিন মাস ধরে বন্ধ।” সহকারী যত্নকারক জেসমিন আক্তার বলেন, “আমাদের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ বা ফ্যান নেই, গরমে বাচ্চারা আসে না। টিফিনের ব্যবস্থা থাকলে শিশুরা আগ্রহী হতো।”
সাঁতার প্রশিক্ষণও বন্ধ অনিয়মে। সাঁতার প্রশিক্ষক রোবিনা আক্তার জানান, “নয় মাস কাজ করেছি, তিন মাসের বেতন পেয়েছি। তাই সাঁতারের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি।”
স্থানীয়রা বলছেন, সাঁতার প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকায় শিশুরা ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি ৬ বছরের এক শিশুর পানিতে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
দুই পক্ষের দোষারোপে প্রকল্প স্থবির
জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, “যখন পরিদর্শনে যাই, তখন সব ঠিকঠাক দেখি। তবে ভিজিটের বাইরে গ্যাপ থাকে—এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।” অন্যদিকে এনজিও উপপরিচালক সুভাষচন্দ্র পাল বলেন,“সময়মতো বরাদ্দ না পাওয়ায় বেতন দিতে পারিনি। শিশু কর্মকর্তা প্রত্যয়নপত্রে দেরি করেন, সেটিই মূল সমস্যা।”
প্রশাসনের আশ্বাস তদন্তের
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
২৫ কোটি টাকার প্রকল্প, মাঠে নেই স্বচ্ছতা
২০২২ সালে দেশের ১৬ জেলায় শুরু হওয়া ‘আইসিবিসি’ প্রকল্পে নীলফামারীতে প্রতি বছর ব্যয় দেখানো হয় ৬ কোটি টাকার বেশি। এখন পর্যন্ত এই জেলায় ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। শিশুদের বিকাশ ও সুরক্ষার নামে নেওয়া এই উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও লুটপাটের প্রতীকে।
স্থানীয়দের মতে—“শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার নামে চলছে দুর্নীতির খেলা। এই লুটপাট বন্ধ না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো প্রজন্ম।”
এনএএন টিভি / ওমর ফারুক


One Reply to “নীলফামারীতে আইসিবিসি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি, তদন্তের দাবি স্থানীয়দের”
Comments are closed.