আজ আর কারোও ঘুম ভাঙ্গে না হাতুরির শব্দ আর ঝনঝনানি আওয়াজে। অথবা সময় হয়েছে কাজে যেতে হবে এমনটি ও মনে হয়না অনেক পরিবারের। খেটে খাওয়া মানুষ গুলোর ভাবনা নেই আগের মতো। আজ আর পালের বাজার নেই, নাগের হাটের নাগ পরিরাও যেন ঘুমিয়ে পরেছে অনেক আগেই এই জেলার।
স্বর্ণ নয়, কিন্তু তার মতই চকচকে। একসময় স্বর্ণের পরেই ছিলো অবস্থান। ছিলো আভিজাত্যের মর্যাদা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর দৃশ্যের আড়াল হয়ে গেছে। মাত্র দু-তিন দশক আগেও এসব প্রাচীন ধাতব পণ্যের যে সমাদর ছিলো, তা যেন কালের অতলে হারিয়ে গেছে। খুঁজে পেতে রীতিমতো অনুসন্ধান করতে হয়।
বিক্রমপুরে মুন্সীগঞ্জ উপজেলার লৌহজংয়ে পদ্মার কড়াল ঘ্রাসে আজ অনেকটাই নিস্ব এই পেশার এ মানুষ গুলো সাধ থাকলেও সাধ্য যেন অনেকটাই ঝিমিয়ে পরেছে তাদের।
দিঘলীর পালের বাজার আর লৌহজংয়ের নাগের হাটের দেড় শতাধিক তামা কাসা আর পিতলের দোকান ও কারখানা এখন এসে দাড়িয়েছে মাএ ৫ থেকে ৬ টি দোকানে,ও ৩টি কারখানায়। তাও আবার অর্থের অভাবে এই শেষ স্মৃতিটুকু তাদের বিলীন হতে বসেছে।
কনকসার বাজারের কাসারু পট্টির মোঃ রিয়াজ মাল ৩৫ বছর ধরে কারীকর হিসেবে এ পেশায় নিয়োজিত আছেন। তবে গত সময়ের বেশ অনেক মালিকরা এই ব্যবসা ছেরে দেয়ায় তিনি নিজেই এখন মালিক হিসেবে এই ব্যবসার হাল ধরেছেন তাতেও যেন শেষ রক্ষা হচ্ছে না।
কারন অর্থের অভাবে এই শিল্প এখন অনেকটাই মুখ থুবরে পড়েছে। তাছারা পদ্মার ভাঙ্গনে পালের বাজার বিলীন হওয়ার পর থেকেই এ ব্যাবসার অনেকটা ধস নেমেছে। মেলামাইন আর ঝকঝকে স্টিলের ব্যবহারে, তামা কাসা আর পিতলের ব্যাবহার এখন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। এক সময়ের হাড়ি পাতিল, পুজার বাটা,মালসা,পুজার কলস,গ্লাস,থালা, পানের বাটা, মগ, কুপি বাতি, কলস, চারি ইত্যাদি তৈরী করা হতো এবং এসব জিনিসের খুব কদর ও ছিলো আজ কালের গর্বে হারিয়ে যেতে বসেছে এসব পুরোনো সব ঐতিহ্য। কনকসার গ্রামের শামসুন্দর কংস বনিক জানান, তার কারখানায় ৩জন পুরুষ শ্রমিক আর ৭জন নারী শ্রমিক রয়েছে যাদের দিয়ে বর্তমানে চলছে এই ব্যবসা।
মজুরী হিসেবে তাদেরকে দিতে হচ্ছে কেজি প্রতি ৪০ টাকা, এক জন শ্রমিক দিনে ১০ থেকে ১২ কেজি তামা কাসা ও পিতলের কাজ করতে পারেন, এখান থেকে এক জন শ্রমিক দিনে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা রোজগার করতে পারেন অনায়েসে।

নারীশ্রমিকরা ঘরে বসে সংসারের কাজের পাশাপাশি হাড়ি পাতিল ও থালা মগ বানানো কাজটি করছে। সংসারের অন্যসব কাজ সেরে অবসর সময়ে একাজ করে ভাল আয় ও করছে তারা। মার্কেটে এই জাতিয় জিনিসের চাহিদা হলে তখন চাহিদা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে ৮/১০ মন মাল তৈরি করতে পারে একজন ব্যাবসায়ী। বর্তমানে বাজারে তামার দর রয়েছে ৬৫০ টাকা, কাসা ১,৬৫০ টাকা, পিতল ৪৯০ টাকা। এসব জিনিসের চাহিদা বাজারে খুব একটা না থাকায় আগ্রহ হারাচ্ছে অনেকেই। আবার অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে সব কিছু গুটিয়ে।
যেখানে দুইটি বাজারে দেড় শতাধিক দোকানে চলতো এই ব্যাবসা সেখানে সারা লৌহজং উপজেলায় কনকসার বাজারে মাএ ২ টি কারখানা রয়েছে তামা কাসা ও পিতলের। কারখানার মালিকরা জানান, বর্তমানে অর্থের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এক সময় কালের গর্বে হারিয়ে যাবে। ব্যাবসায়ীদের দাবি এ শিল্প বাচাঁতে এবং তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিতে সরকারী ব্যাংক গুলো এগিয়ে এলে এবং সহজ উপায়ে তাদের ব্যাংক লোনের ব্যাবস্থা করে দিলে এই শিল্পটি বাচিঁয়ে রাখা স¤ভব।
এমন ঝকঝকে চকচকে ধাতব পণ্য দেখলে কার না মন টানে। স্বর্ণের মতোই যেন রূপ, কিন্তু নামে কাঁসা ও পিতল। এসব ধাতু তৈরি অবস্থায় সরাসরি প্রকৃতি থেকে পাওয়া না গেলেও, যেসব উপাদান মিশিয়ে মানুষ কাঁসা ও পিতল তৈরি করে, সেসব প্রকৃতি থেকেই মেলে। এই দুই ধাতব পণ্য অতি প্রাচীন। আদিম যুগে মাটির পাত্র পোড়ানোর সময় এসবের উপাদানের সন্ধান মেলে। এ প্রসঙ্গে ইস্থানিয় লেখক ও কবি মোঃ মিজানুর রহমান ঝিলু বলেন, “কাঁসার ব্যবহার অনেক পুরোনো। যখন কাঁসা আবিষ্কার হলো, তখন চৈনিক সভ্যতায় এর ব্যবহার আমরা প্রচুর দেখতে পাই।” “কাঁসার আবিষ্কার হয়েছে পাথর থেকে , পরে এটা গলিয়ে এটার বিভিন্ন আকার দেয়া হয়।”
একসময় বিশ্ব জুড়েই কাঁসা-পিতলের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। ভারত উপমহাদেশেও সেই চর্চার বিস্তৃতি ঘটে স্বাভাবিক্ররভাবেই। খুঁজলে নানান দেশে কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসের ঐতিহাসিক ব্যবহারের নিদর্শনও পাওয়া যাবে। কাঁসা-পিতলের ব্যবহার যুদ্ধসামগ্রী এবং শিল্পকমের্ও খুঁজে পাওয়া যায়।
তিনি আরো বলেন, “ব্রোঞ্জ দিয়ে তলোয়ার তৈরি হতো। এটা দিয়ে তির-ধনুকও তৈরি হতো।”ভাস্কর্য তৈরির পাশাপাশি কাঁসা ও পিতলের বাসনপত্র ব্যবহারের একটা প্রচলন শুরু হয়েছিরো আমাদের এই অঞ্চলে।”
ভারত উপমহাদেশে ১৮ ও ১৯ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে কাঁসা-পিতলের সামগ্রী রীতিমত আভিজাত্যের প্রতীক ছিলো। ব্যয়বহুল এসব ধাতব সামগ্রী সাধারণের জন্য ছিলো স্বপ্নের মতো। মূলত সমাজের বিত্তশালী ও প্রতাপশালী মানুষেরাই এসব পণ্য ব্যবহার করতো।
এ শিল্পের সাথে ৪০ বছর ধরে জড়িত নাগের হাটের গোবিন্দ্র কংশ বণিক বলেন, “আমার পরিবার এই শিল্পের সাথে ২০০ বছর জড়িত। আমি হচ্ছি পঞ্চম প্রজন্ম, যে এখনও চেষ্টা করছে এ শিল্প চালিয়ে যাওয়ার।”
গত কয়েকশ বছরে দেশের বিভিন্ন জনপদে কাঁসা-পিতলের সামগ্রী তৈরির কারখানা বিস্তৃত হয়েছিলো ঢাকার ধামরাই ও শিমুলিয়া, টাঙ্গাইলের কাগমারি, জামালপুরের ইসলামপুর, বগুড়ার শিববাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের লৌহজংসহ নানান এলাকায়। এসব এলাকার অনেকগুলোতে গত কয়েক দশকে সে-আয়োজন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার কোথাও টিকে থাকলেও তা টিম টিম করা জ্বলা প্রদীপের মতো জ্বলছে। পুরো বিক্রমপুরের লৌহজংয়ে মাত্র ৪টি কারখানা ।
এনএএন টিভি / রুবেল ইসলাম তাহমিদ
