যুদ্ধের ছায়ায় তেহরান: নিজ ঘরের’শেষ ছবি’

যুদ্ধের ছায়ায় তেহরান: স্বপ্ন, ঘরবাড়ি আর অস্তিত্বের সংকটে নগরবাসী
ইসরায়েলি হামলায় মৃত্যু ও আতঙ্ক—নতুন বাস্তবতায় ইরান
ইসরায়েলি বাহিনীর লাগাতার বিমান হামলায় তেহরানসহ উত্তর ইরানের বড় একটি অঞ্চল রীতিমতো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সোমবার ইসরায়েল বাসিন্দাদের ‘অবিলম্বে শহর ত্যাগের’ আহ্বান জানায়। এরই মধ্যে বহু মানুষ শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

চার দিনে নিহত ২২৮, আতঙ্কে জনপদ
ইসরায়েলি হামলার প্রথম চার দিনেই ইরানে নিহত হয়েছেন অন্তত ২২৮ জন। পাল্টা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। ইসরায়েলের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনা, কিন্তু এখন তা বিস্তৃত হয়ে আবাসিক এলাকাতেও হামলা চলছে।

তেহরান ছেড়ে যাওয়ার সময় কেন নিজের বাড়ির 'শেষ ছবি' শেয়ার করছেন ইরানিরা?
তেহরান ছেড়ে যাওয়ার সময় কেন নিজের বাড়ির ‘শেষ ছবি’ শেয়ার করছেন ইরানিরা?

ঘর ছেড়ে না ফেরার শঙ্কা
একজন বাসিন্দা সামাজিক মাধ্যমে তার কাজ করার টেবিল, কম্পিউটার আর একজোড়া হেড-ফোনের ছবি দিয়ে লিখেছেন, “যেসব জিনিসগুলো পেতে এত পরিশ্রম করেছি, সেগুলোকে বিদায় জানালাম। এগুলো পেতে কত রাত জাগতে হয়েছে, মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে। আশা করি যখন আমি ফিরে আসব, এগুলো এখানেই থাকবে।”

আরেকজনের কথায়, ‘কখনো এত দুঃখ হয়নি। জানি না আর কোনো দিন ফিরতে পারব কি না।”

‘নীরবে বিদায় জানালাম’

একজন লিখেছেন: “প্রিয়জনদের কাছ থেকে পাওয়া ছোটখাটো উপহার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছি। গাছগুলোতে জল দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট সহ্য করাটা খুব কঠিন, বিশেষ করে আপনি যখন নিশ্চিত নন যে কখনো ফিরতে পারবেন কি না।

প্রায় এক কোটি মানুষের শহরটির আরেক বাসিন্দা লিখেছেন যে “বিশ্ববিদ্যালয় আর কাজ করার” অনেক স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজধানী শহরটায় এসেছিলেন।

অনেকে লিখছেন, “কত স্নেহ দিয়ে আর পরিশ্রম করে বাড়ির জন্য কত কিছু কিনে ঘরটা সাজিয়ে তুলেছিলাম। একদিনে আমার এই সুন্দর নিরাপদ আশ্রয়টায় ফিরে আসব, এই আশা নিয়েই আমি নীরবে বিদায় জানালাম।”
আরেকজন বলেন,
“এই শহরে কাজের স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম। নিজ হাতে বানানো এই বাসায় একদিন ফিরতে পারব—এই বিশ্বাসেই বিদায় জানালাম।”

সবাই পারছেন না তেহরান ছাড়তে
তবে সবার পক্ষে শহর ত্যাগ সম্ভব হচ্ছে না। কেউ আছেন বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্বে, কেউ অসুস্থ সন্তানের কারণে আটকে আছেন।

এক অন্তঃসত্ত্বা নারী বলেন,
“আমি গর্ভবতী, ছোট বাচ্চা আছে। এই অবস্থায় কোথায় যাব? সবই তো এখানে গড়া।”

আরেকজন বলেন,
“গাড়ি আছে, কিন্তু ৮০০ কিলোমিটার রাস্তায় যদি গাড়ি নষ্ট হয়, তখন কী করব?”

এক ৪০ বছর বয়সী নারী বলেন,
“আমি এতটাই ক্লান্ত যে এখন যদি সব ধ্বংস হয়, সন্তানদের নিয়ে এখানেই শেষ হয়ে যেতে চাই। আবার শুরু করার শক্তি আমার নেই।”

বিদেশে থাকা প্রবাসীদের চোখে অশ্রু
ইরানের বাইরে থাকা লাখো প্রবাসী ইরানিও এই সংকটে মানসিক যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন। ইন্টারনেট সংযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী লিখেছেন,
“আমরা ভাবতাম বাড়ির জন্য মন খারাপ করাটাই অভিবাসনের সবচেয়ে কষ্টের দিক। এখন বুঝছি, যুদ্ধের সময় দূরে থাকার যন্ত্রণা আরও ভয়াবহ।”

এক প্রবাসী জানান,
“তেহরানে থাকা আত্মীয়কে বলেছি সরে যেতে। সে বলেছে—না আছে টাকা, না আছে কোথাও যাওয়ার জায়গা। উপদেশ দিয়ে লাভ নেই।”

অস্তিত্ব সংকটে তেহরানবাসী
এই যুদ্ধ তেহরানবাসীর কাছে কেবল একটি ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়। এটি এক অস্তিত্ব সংকট—যেখানে তারা হারাতে বসেছেন ঘরবাড়ি, স্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এক অনিশ্চিত কাল তাদের সামনে অপেক্ষা করছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এন এ এন টিভি

Share this news as a Photo Card