বাড়তি আয়ের আশায় অনলাইনে বিনিয়োগ করে, ১০ দিনে কোটি টাকা খোয়ালেন ব্যাংক কর্মকর্তা
চাকরিতে বেতন ধরাবাঁধা। অনেকেই তাই চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ খোঁজেন। পুরান ঢাকার এক ব্যাংক কর্মকর্তাও আরেকটু সচ্ছলতার আশায় অনলাইনে বিনিয়োগ করেছিলেন। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নয়; ১০ দিনের ব্যবধানে বিনিয়োগ করেছিলেন ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেই টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছেন প্রতারকেরা।
পুরান ঢাকা, ২২ জুন ২০২৫ – পুরান ঢাকার এক ব্যাংক কর্মকর্তা মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন, এবং ২১ মে তিনি লালবাগ থানায় প্রতারকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।
কীভাবে ঘটলো প্রতারণা
ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে নাজনীন নামের এক নারীর খুদে বার্তা আসে। তাতে লেখা ছিল, অনলাইনে পার্টটাইম জব (খণ্ডকালীন চাকরি) করা যাবে। প্রতিষ্ঠানের নাম আপওয়ার্ক। তিনি আপওয়ার্কের একজন প্রতিনিধি। চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় তিনি (ব্যাংক কর্মকর্তা) ওই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় প্রভাবিত হয়ে কথিত আপওয়ার্কের ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করেন।
শুরুতে তিনি বিকাশ–এ/টাস্ক শেষে ২,১০০–২,৮০০ টাকা পান। কিছুদিন পর টেলিগ্রাম-ভিত্তিক VIP গ্রুপে যুক্ত হন, যা “আপওয়ার্ক ফ্রন্টডেস্ক–২০২৩” হিসেবে পরিচিত ছিল।
গত ২১ মে লালবাগ থানায় অজ্ঞাত ওই প্রতারকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় কথিত ‘আপওয়ার্ক ফ্রন্টডেস্ক–২০২৩’–এ গত বছরের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করেছিলেন। শুরুর দিকে কয়েক দিন ওই প্ল্যাটফর্ম থেকে কয়েক হাজার টাকা ‘আয়’ও করেন। একপর্যায়ে তাঁকে কথিত আপওয়ার্কের অংশীদার হওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়।
এরপর ক্রিপ্টো একাউন্ট খুলতে বলা হয়; বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করে। ১২–২২ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি জাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১.১০ কোটি টাকা জমা দেন, অভিযোগকারীদের ‘অংশীদার’ হওয়ার প্রলোভনে ।
সেই ফাঁদে পা দিয়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এক কোটি টাকা ওই প্ল্যাটফর্মের কথিত পরিচালকদের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে জমা দেন। পরে অংশীদার হওয়ার কাগজ পেয়ে দেখেন সেটি ভুয়া। প্রতারকদের মুঠোফোন বন্ধ!
প্রতারণা পদ্ধতি (পিগ- -বাটচেরিং স্ক্যাম )
মূল উদ্দেশ্য: প্রথমে ছোট লাভ দেখানো, ভরসা তৈরি করা, তারপর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করানো ।
সামাজিক ইঞ্জিনিয়ারিং: হোয়াটসঅ্যাপে প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ, টেলিগ্রামে ভি আই পি গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্বাস গড়ে তোলা, দ্রুত বিনিয়োগের দাবী ।
আন্তর্জাতিক প্রতারণা কেন্দ্র: দক্ষিণপূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাসকারী সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালিত ”পিগ- বাটচেরিং” স্ক্যাম কেন্দ্রগুলি বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষকে টার্গেট করছে
ব্যক্তিগত ও মানসিক প্রভাব
ঋণ ও সঞ্চিত অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করে ফেলায় ডিপ্রেশনে ছিলেন; পরিবার ও আত্মীয়রা তাকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা দিয়েছেন।
বিপুল অঙ্কের টাকা খুইয়ে চরম হতাশ হয়ে পড়েন ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। কয়েক দিন ঘরবন্দী হয়ে থাকেন। আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু করেন। মামলা করেন প্রতারকদের বিরুদ্ধে।
২১ মে লালবাগ থানায় মামলা করেছেন; ওসি জানিয়েছেন এটি একটি সম্পূর্ণ জাল আপওয়ার্ক ফ্রন্টডেস্ক স্ক্যাম, এবং তদন্ত চলছে।
জাগ্রত দৃষ্টি ও সতর্কতা
যাচাই করুন আপওয়ার্ক বা বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে অফারের যাচাই গুরুত্বসহকারে করুন
ভারসাম্য রাখুন হোয়াটসঅ্যাপ/ টেলিগ্রাম লিঙ্ক থেকে সরাসরি নিবন্ধন বা বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকুন
মেটা (ফেসবুক) এবং টেলিগ্রাম–সহ বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এই ধরনের স্ক্যাম মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ।
এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা গেলো, কত সহজেই অনলাইন প্রতারণীর ফাঁদে পড়া যায়—এমনকি সচেতন, শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ব্যক্তিরাও। অনলাইনে কাজ বা বিনিয়োগের সুযোগ পেলে সর্বদাই যাচাই করুন, বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিন, এবং ভয়ের জায়গা না নিয়ে সাবধানতার সঙ্গে এগোন।

One Reply to “ডিজিটাল প্রতারণায় ১০দিনে ব্যাংক কর্মকর্তার ১.১০ কোটি টাকা লুট”
Comments are closed.