বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে 

বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনীতি আগামীতে বৈশ্বিক ও দেশের ভেতর থেকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে এগোতে হবে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপের কারণে বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এখনো বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বিদ্যমান রয়েছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও কম। যে কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের জোগান দুই-ই কম। রাজস্ব আয় কম হওয়ায় সরকারের ব্যয়ও কম হচ্ছে। সব মিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। যে কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারের প্রাক্কলন কমানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের অনুকূলে ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি ছাড় উপলক্ষ্যে আইএমএফ সার্বিক অর্থনীতির একটি মূল্যায়ন করেছে। এতে দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরেছে। পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী কোন সময়ের মধ্যে কী কী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে সেগুলোর একটি পরিকল্পনাও দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা হতে উত্তরণে চূড়ান্ত সুপারিশ জাতিসংঘ অনুমোদন করেছিল ২০২১ সালের নভেম্বরে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলবে আগামী বছরের নভেম্বরে। তিনটি মানদণ্ডে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে উত্তীর্ণ হতে হয়েছে   ।

দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ উত্তরণ অবশ্যই চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার। তবে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে অনেক ধরনের সুবিধাপ্রাপ্ত হয়। এক. শুল্ক ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা। দুই. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, নানা ধরনের ছাড়, দীর্ঘ বাস্তবায়ন কাল ইত্যাদি। তিন. আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা। চার. বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সাহায্য। তাছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের জন্য জাতিসংঘে চাঁদার পরিমাণ অনেক কম থাকে, সেটা আর থাকবে না। আইএলও ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ হারে বার্ষিক চাঁদা পরিশোধ করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবার বেড়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। তখন দেশটি বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতির ওপর চাপ পড়বে। চলতি অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতির ঘাটতি জিডিপির হারে কমলেও আগামী বছরগুলোতে তা বেড়ে যেতে পারে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ঘাটতি জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশের মধ্যে নেমে আসতে পারে। কিন্তু আগামী বছরগুলোতে এ ঘাটতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে আইএমএফ। এতে ডলার বাজারের ওপর চাপ বাড়বে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বেশ ভালোভাবেই প্রভাবিত করে। কারণ দেশটির রেমিট্যান্সের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এসব দেশে অস্থিরতা তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির অভাবে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বা বিশেষ করে উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির ওপর ট্রাস্প প্রশাসন যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে তাতে পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। কারণ রপ্তানির আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। তৈরি পোশাকের ৫৪ শতাংশই রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ক্ষতের মধ্যে পড়েছে তা এখনো সেরে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে এসব সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এসব সংকট মোকাবেলার জন্য আইএমএফ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি এ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে বাজেটের ওপর চাপ কমানোর কথা বলেছে। জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত হলে উৎপাদন খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হবে। তখন তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। এতে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক বিষয়ে একটি সন্তোষজনক সমাধানের কথা বলা হয়েছে; যাতে পোশাক রপ্তানি বাধাগ্রস্ত না হয়। পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রে একক পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী করার সুপারিশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমদানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশে কৃষিপণ্যের ওপর উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে বিভিন্ন খাতে লক্ষ্য অর্জনের সময় সীমাও বেঁধে দিয়েছে। এর মধ্যে চলতি জুনের মধ্যে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ব্যাপকভাবে সংস্কার করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। করদাতাদের হয়রানি কমাতে ই-রিটার্ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে করদাতাদের উন্নত সেবা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এনবিআরকে। সব ধরনের কর ছাড় বন্ধ করতে হবে আগামী বছরের মার্চের মধ্যে। চলতি জুনের মধ্যে সরকারি লেনদেনের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অনলাইনে করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়দেনা নিশ্চিত করতে তা পরিশোধ করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণকে বেসরকারি খাতের মতো করে শ্রেণিবিন্যাসিত করতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করতে হবে চলতি মাস জুনের মধ্যে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এ খাতে দেওয়া ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিময় হারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এককভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে দিতে হবে। এ খাতে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না।

আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে মুদ্রানীতি প্রণয়নের ও বাস্তবায়নের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

 

এন এ এন টিভি