একটা সময় ছিল যখন উৎসব-পার্বণ কিংবা শখের বসে মানুষ স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন সেটি অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় আধিপত্য কমে গেছে ছবি তোলার স্টুডিওর কদর।
এখন মানুষ চাইলেই তাদের ইচ্ছে মতো ছবি তুলতে পারেন মোবাইল ফোনের ক্যামেরার মাধ্যমে। সৌখিন কিংবা প্রয়োজন, যেকোনো ছবিই ঝটপট মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তুলে ফেলছেন। ফলে স্টুডিওতে মানুষ যাননা বললেই চলে।
মোবাইল ফোনের সঙ্গে লড়াই করে এখনও যেসব স্টুডিও টিকে আছে সেখানে মূলত অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ছবিই তোলা হয় বেশি।
অনেক আগেই হারিয়ে গেছে ডার্করুম, নেগেটিভ, ফিল্ম ডেভেলপ করা ও ছবি পজিটিভ করার প্রাচীন পদ্ধতি।
একটা সময় স্মৃতি ধরে রাখতে স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলার প্রচলন ছিল মোটামুটি সব মহলেই। পরিবারের সদস্যরা, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সে সব ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকত নানা ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য। স্টুডিওর দেওয়ালে আঁকা ছবিতে শোভা পেতো ফুল, লতা-পাতা। কিন্তু আজকের দিনে এমন স্টুডিও খুঁজে পাওয়াও বেশ কঠিন।
স্টুডিওর ছবি তোলার ব্যবসা মন্দার কারণে অনেকে এই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। বেকার হয়েছেন এই পেশার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ।
খোকসা পৌর বাজারের রূপসা স্টুডিওর মালিক স্বপন ঘোষ এনএএন টিভিরকে বলেন, “১৯৮৩ সালের দিকে স্টুডিও ব্যবসা শুরু করেছিলাম। প্রথম দিকে ব্যবসা ভালোই চলেছে। এরপর ডিজিটাল মাধ্যম আসার পর আমাদের ব্যবসায় ধস নামলো। ডিজিটাল মাধ্যমে ছবি তোলা শুরু হাওয়ার পর আমাদের ব্যবসা বিলুপ্ত হয়ে গেল।”
তিনি আরও বলেন, “সে সময় আমাদের প্রযুক্তি জ্ঞান ছিল না এবং কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে স্টুডিও ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি।”
একই এলাকার প্রদীপ স্টুডিওর মালিক প্রতাপ সাহা বলেন, “১৯৭০ সালে প্রথম স্টুডিওতে ছবি তোলার ব্যবসা শুরু হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত স্টুডিও ব্যবসা ভালই চলেছে। আগে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০ ছবি তোলা হতো। এছাড়াও ফ্লিম বিক্রি, ক্যামেরা ভাড়া দেওয়া হতো। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব যেমন বিয়ে, জন্মদিন, সুন্নতে খৎনা, সভা সেমিনারসহ সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানে ক্যামেরা ভাড়া দেওয়া হতো। সে সময় ব্যবসাও হয়েছে বেশ ভালো। তবে মোবাইল ক্যামেরার প্রচলন চালু হাওয়ার পর থেকে স্টুডিওতে এসে ছবি তোলার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেল। ফলে স্টুডিও ব্যসবা অনেকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।”
খোকসা সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নিপা বলেন, “আমি কখনোই শখের বসে স্টুডিওতে গিয়ে ছবি উঠায়নি। তবে আমাদের বাসায় এখনও স্টুডিওতে ওঠানো কিছু ছবি রয়েছে। তবে এসব ছবির বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে।”
এ বিষয়ে শিক্ষক পুলক সরকার এনএএন টিভিকে বলেন, “আগে একটি ছবি ওঠানোর পর সেটি হাতে পেতে ৩-৪ দিন অপেক্ষা করতে হতো। এতে সময় এবং অর্থের অপচয় হতো। কিন্তু এখন প্রযুক্তির সহজীকরণের কারণে মানুষ আর স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলে না। এখন চাইলেই মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় ছবি তুলতে পারেন। ছবি প্রিন্ট করার জন্য এখন আর তেমন ঝুক্কি পোহাতে হয় না। এখন মানুষ নিকটস্থ যেকোনো কম্পিউটারের দোকান থেকেই তার প্রয়োজনীয় ছবি প্রিন্ট করে নিতে পারেন।
নাজমুল হাসান / এনএএন টিভি
