পূর্বধলায় কিশোর কর্মীকে বলাৎকার: মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতা গ্রেপ্তার

সমাজে যাদেরকে মানুষ সম্মানের চোখে দেখে, যাদের ওপর সমাজের প্রান্তিক মানুষরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নির্ভর করে, সেই রক্ষকই যখন ভক্ষকের রূপ নেন, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এমনই অমানবিক ও আস্থার চরম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায়। নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরকে বলাৎকারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫২ বছর বয়সী দুলাল মিয়া।

অভিযুক্ত ব্যক্তি কেবল স্থানীয় ‘মা ফার্মেসি’-র মালিকই নন, তিনি একই এলাকার ‘রওজাতুল আকফাল নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা’-র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। একজন ধর্মানুরাগী ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির এমন স্খলনের খবরে গোটা উপজেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) রাতের শান্ত পরিবেশ এই শিশুটির জীবনের এক দুঃসহ স্মৃতি হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কিশোরটি দুলাল মিয়ার ফার্মেসির কাজ শেষ করে নিজ বাড়িতে ফিরে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাত সাড়ে ৯টার দিকে আকস্মিকভাবে মালিক দুলাল মিয়া তাকে ডেকে পাঠান।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শিশুটি হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি, যে মানুষটির প্রতিষ্ঠানে সে কাজ করে, তিনি তাকে নিজের শোবার ঘরে ডেকে নিয়ে এমন পাশবিক নির্যাতন চালাবেন। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন অভিজ্ঞতার শিকার হওয়ার পর, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ভুক্তভোগী কোনোমতে বাড়িতে ফিরে তার পরিবারকে ঘটনাটি খুলে বলে।

রাতের আঁধারে ঘটে যাওয়া ন্যক্কারজনক ঘটনার খবর মুহূর্তের মধ্যে জালশুকা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একজন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ীর এমন ঘৃণ্য কাজের কথা শুনে সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাতেই বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের ফার্মেসিতে ঘেরাও করে ভাঙচুর চালায়। ক্ষোভের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল, একপর্যায়ে স্থানীয়রা নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিচারের দাবিতে সোচ্চার হন। রাতের অন্ধকারে মহাসড়কে থমথমে ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় শ্যামগঞ্জ তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ। তবে ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে বেগ পেতে হয় তাদের। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত ১২টার দিকে সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা- উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শফিকুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হাবিবুর রহমান। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে রাতেই অভিযুক্ত দুলাল মিয়াকে আটক করা হলে জনতা শান্ত হয় এবং মহাসড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

ভুক্তভোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে উপজেলা প্রশাসন। ইউএনও মো. শফিকুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই তারা পুলিশ প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সুচিকিৎসার জন্য রাতেই তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশাসনের অনড় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।

পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‍“এ ঘটনায় ইতিমধ্যে ভুক্তভোগীর বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। অভিযুক্তকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।”

সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য এই ঘটনাটি গভীর সতর্কবার্তা। কর্মস্থলে, বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের নিরাপত্তা আজ কতটা ভঙ্গুর, তা এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যে সমাজে একজন মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ীর কাছেও শিশু-কিশোররা নিরাপদ নয়, সেখানে নৈতিকতার অবক্ষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও, এখন সবার নজর সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রক্রিয়ার দিকে। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক না কেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত হলেই কেবল সমাজে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।

 

এনএএন টিভি

Share this news as a Photo Card