নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রতিদিন একজন ভোটারকে ১০ লাখ ডলার ‘পুরস্কার’ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইলন মাস্ক। এরই মধ্যে সেই অর্থ তুলেও দিয়েছেন তিনি। মূলত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণায় এ অর্থ পুরস্কার দিচ্ছেন তিনি।
তাহলে মাস্ক কি টাকা দিয়ে ভোট কিনছেন? এটা আদৌ বৈধ? কি বলছেন আইনজ্ঞরা? ট্রাম্পের প্রচারণায় কেন এত অর্থ ঢালছেন মার্কিন এই ধনকুবের?

ভোটার টানতে ইলন মাস্কের কৌশল
মার্কিন নির্বাচনে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলো বিশেষ করে জর্জিয়া, নেভাদা, অ্যারিজোনা, মিশিগান, উইসকনসিন এবং নর্থ ক্যারোলাইনায় ভোটারদের বাক স্বাধীনতা এবং অস্ত্র বহনের অধিকারের পক্ষে একটি পিটিশন সইয়ে উৎসাহিত করতে প্রচারণা চালাচ্ছে ইলন মাস্কের আমেরিকা পিএসি। আমেরিকা পিএসি রিপাবিলকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করছে। তবে প্রচারণার লক্ষ্য অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে উদ্যোগটি৷ আর এখানেই কৌশল নিয়েছেন মার্কিন ধনকুবের।
যারা সই করে অন্য ভোটারকে রেফার করেন তাদের প্রত্যেককে ৪৭ ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। ট্রাম্প ও কমলার ভাগ্য নির্ধারণে অন্যতম ভূমিকা রাখবে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্য। আর এখানে ভোটারদের সর্বোচ্চ ১০০ মার্কিন ডলার দেয়া হচ্ছে এবং একই রাজ্যে নিবন্ধিত আরেকজন ভোটারকে পিটিশন সই করতে পাঠালেও ১০০ মার্কিন ডলার দেয়া হচ্ছে।
এরপর নতুন ঘোষণা দিয়েছেন ইলন মাস্ক। আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোয় প্রতিদিন একজন ভোটারকে ১০ লাখ ডলার করে পুরস্কার দেবেন তিনি। মাস্ক তার ‘আমেরিকা প্যাক’ কর্মসূচি বা ট্রাম্প-সমর্থক রাজনৈতিক কার্যক্রম কমিটির মাধ্যমে প্রতিদিন এই অর্থ দেবেন বলে জানিয়েছেন। এই কর্মসূচিতে নিরাপদ সীমান্ত ও শহর, বৈষম্যহীন বিচার ব্যবস্থা, বাকস্বাধীনতাকে সমর্থন দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই পিটিশনে যারা সই করবেন, তাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজনকে বাছাই করে এই অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে। এরই মধ্যে ১৯ অক্টোবর পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রচারণা সমাবেশে এক ভোটারের হাতে চেক তুলে দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু করেছেন তিনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরদিনও চেক তুলে দেন আরেকজনকে।
এটা কি বৈধ?
ইলন মাস্কের এ ধরনের পুরস্কারকে অবৈধ বলছেন বিশ্লেষকরা। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক পল শিফ বারম্যান বলেন, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কেউ যদি ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধন কিংবা ভোট দেয়ার জন্য অর্থ প্রদান করে বা অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দেয় আবার যে তা গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে ১০ হাজার ডলার জরিমামান বা পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। মাস্কের প্রস্তাবটি শুধুমাত্র নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য উন্মুক্ত, তাই তার প্রস্তাব এই আইনবিরোধী বলে মনে করেন বারম্যান।
যদিও মার্কিন বিচার বিভাগ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আবার অনেকে বলছেন মাস্ক এমনভাবে কৌশলটি নিয়েছেন যে তিনি সরাসরি ভোটের জন্য কাউকে অর্থ দিচ্ছেন না। নির্দলীয় ক্যাম্পেইন লিগ্যাল সেন্টারের আদাভ নোটি বলেন, ইলন মাস্কের স্কিম কেন্দ্রীয় আইনের লঙ্ঘন। বিচার বিভাগের দেওয়ানি বা ফৌজদারি আইন প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে এটা পরিষ্কার নিবন্ধন করার শর্তে অর্থ প্রদান করা অবৈধ।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-এর সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক জেরেমি পল বলেন, ইলন মাস্ক আইন ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নিচ্ছেন।
ডেমোক্র্যাটরা কী বলেছেন?
ডেমোক্র্যাট নেতা ও পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জোশ শাপিরো মাস্কের এই পদক্ষেপকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সেইসঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এরইমধ্যে তার এই কথায় পাল্টা উদ্বেগ জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। কমলা হ্যারিসের পক্ষে প্রচারণা চালানো আরেক ধনকুবের মার্ক কিউবান বলেন, মাস্কের প্রস্তাব একইসঙ্গে আকর্ষণীয় হলেও এটি ধ্বংসাত্মক।
এমন নজির আর আছে?
রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের উদ্বেগ পেছনে ফেলে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন ইলন মাস্ক। তার দাবি ডেমোক্র্যাট এবং তাদের দাতারা অতীতে এরকম অসংখ্য উদ্যোগে অর্থায়ন করেছে। এক্স- পোস্টে তার দাবি মেটার বস মার্ক জাকারবার্গ ২০২০ সালের নির্বাচনে একই কাজ করেছিলেন। জাকারবার্গ সে বছরের নির্বাচনে ৪ কোটি ডলার দান করেন।
তবে এটি পোস্টাল ব্যালটের আশেপাশে সরবরাহের জন্য সহায়তা করার জন্য দুটি নির্দলীয় সংস্থাকে দেয়া হয়েছিল। এটি সরাসরি ভোটারদের দেয়া হয়নি। ২০২২ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সমর্থকদের একত্রিত করার জন্য আড়াই কোটি ডলার খরচ করে ভোটার নিবন্ধন প্রচারণায়। তবে এই টাকাও সরাসরি ভোটারদের দেয়া হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার নিবন্ধন করার জন্য মানুষকে অর্থ প্রদান করা বৈধ, তবে নিবন্ধিত ভোটারদের অর্থ দেয়া অবৈধ।
নির্বাচনে আর কী করেছেন মাস্ক?
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন ইলন মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্পের খুব একটা সুসম্পর্ক ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে মাস্ককে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, তিনি ঘোষণা দেন তিনি দলত্যাগ করেছেন এবং তার অনুসারীদের রিপাবলিকানকে ভোট দিতে উৎসাহিত করেন।
এ বছর, মার্কিন রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন ইলন মাস্ক যেমনটি আগে কখনও দেখা যায়নি। রিপাবলিকানদের অনুদানের পাশাপাশি তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করেন। এ বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থনে প্রচারণায় নামেন মাস্ক। সে লক্ষ্যে গেল জুলাইয়ে চালু করেন আমেরিকা পিএসি।
এখন পর্যন্ত ১১ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন সংস্থাটিতে। আমেরিকা পিএসি’র ওয়েবসাইট বলা আছে তারা ‘সুরক্ষিত সীমানা’, ‘নিরাপদ শহর’, ‘স্বাধীনতা’, ‘বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ব্যয়’, একটি ‘ন্যায্য বিচার ব্যবস্থা’ এবং ‘আত্ম-সুরক্ষা’ চায়। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের প্রচারাভিযানে উপস্থিত হয়েও ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে মাস্ককে।
