কুরবানি হলো মুসলিমদের একটি ইবাদত যা প্রতি বছর বিত্তবানদের উপর আরোপিত হয় নির্দিষ্ট সময়ে এবং এ ইবাদাতের মাধ্যমে মুসলমানগণ মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করে থাকে। আরবিতে করব বা কুরবান (قرب বা قربان) শব্দটি উর্দূ ও ফার্সীতে (قربانى) কুরবানি নামে রূপান্তরিত। এর অর্থ হলো-নৈকট্য বা সান্নিধ্য।
গুরত্বপূর্ণ এই ইবাদতটি করতে হবে মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ি তবেই তা আল্লাহ তায়ালার নিকটে গ্রহনযোগ্য হবে।
আজকের মুসলিম সমাজে কুরবানির যে প্রথা চলমান আছে, এ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কুরবানি কী? এটা কোথা থেকে এসেছে? প্রিয় নবী (সা.) উত্তরে বললেন, ‘এটা হলো তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত বা আদর্শ। এই আদর্শকে অনুসরণের জন্যই আল্লাহ পাক তোমাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন।’ সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে? উত্তরে মহানবী (সা.) বললেন: ‘কুরবানি জন্তুর প্রতিটি পশমে তোমরা একটি করে নেকি পাবে।
কুরবানীর উদ্দেশ্যঃ
প্রত্যেক মানুষ ইবাদত করবে শুধু তার মহান মালিক আল্লাহ তা’আলার, মোমিন বান্দা তার কোনো ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করবে না। অর্থাৎ ইবাদত হতে হবে সকল প্রকার শির্কমুক্ত, শুধু এক আল্লাহর উদ্দেশে। মহান রাব্বুল আলামিন হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে সে শিক্ষাই দিয়েছেন।
ইরশাদ হচ্ছে: ‘বলুন: নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।’ এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল, কোরবানি শুধু আল্লাহর উদ্দেশেই হতে হবে। লৌকিকতা বা সামাজিকতার উদ্দেশে নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আল্লাহর নিকট ওদের গোশত-রক্ত পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)।
প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন: ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্বাস্থ্য-চেহারা এবং ধনসম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দেন তোমাদের অন্তর এবং আমলের প্রতি। সুতরাং, কোরবানির পূর্বেই কোরবানিদাতার নিয়ত বা সংকল্প শুদ্ধ করে নিতে হবে।
কুরবানীর শিক্ষাঃ
আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কোরবানিকে পরবর্তী মানুষের জন্য অনুসরণীয় করে দেন। যাতে মানুষ বুঝতে পারে এবং শিখতে পারে যে, অর্থ-সম্পদ, টাকাপয়সা, আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে ব্যয় করতে হয়।এমনকি প্রয়োজনে আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও যেন মানুষের কোনো দ্বিধা, সংশয় না থাকে। তা ছাড়া কোরবানি আত্মত্যাগের প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন। মানুষের ষড়রিপু তথা হিংসা, লোভ, কাম, ক্রোধ, ত্যাগের মাধ্যমে মনের পশুবৃত্তি তথা কুপ্রবৃত্তিকে জবাই করতে হবে। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে ধনলিপ্সা, লোভ-লালসা, জাগতিক কামনা-বাসনা এবং দুনিয়াপ্রীতিকে কোরবানি করে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য অর্জন করা কোরবানির শিক্ষা। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গরিবদের মাঝে বিতরণ করা সুন্নত ও অতি উত্তম আমল।
কুরবানীর নানা শিক্ষা রয়েছে, সংক্ষিপ্তভাবে তার সামগ্রিক ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। তবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কুরবানির কয়েকটি শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
১. কুরবানী আমাদের ত্যাগ ও উৎসর্গ শিক্ষা দেয়। আমাদের উপর ইসলামের যে বিধানই আবশ্যক হোক, আমাদের পালন করতে হবে। আল্লাহর রাজি-খুশির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালাতে হবে।
ইসমাইল আঃ ইবরাহীম আঃ এর অত্যন্ত প্রিয় সন্তান ছিলেন। প্রথমে সন্তান হচ্ছিল না, ইবরাহীম আঃ দোয়া করে যাচ্ছিলেন। অনেক দোয়ার সন্তান ইসমাইল আঃ। নেক সন্তান। পিতার মিশন সফলের জন্য উত্তম উত্তরাধিকারী। তবুও, যখন আল্লাহ বললেন তোমার প্রিয় সন্তানকে জবেহ করো। ইবরাহিম আঃ আদেশ পালনে কোন অলসতা করেননি।
আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। সুতরাং আমাদেরও, ইসলামের বিধান মানতে যত কষ্টই হোক, সহ্য করতে হবে। ইসলামের জন্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যথাসম্ভব ত্যাগ স্বীকারের চেষ্টা করতে হবে।
২. কোরবানি শিরক থেকে মুক্ত থাকার একটি কার্যকরী মাধ্যম। ইসলাম মুসলিমদের কোরবানির বিধান দিয়ে তাওহীদ তথা একত্ববাদের বিশ্বাসকে উজ্জ্বল ও দৃঢ় করণের পাশাপাশি এই শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে যে এসব সৃষ্টি করা হয়েছে কোরবানি করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য। এর দ্বারা একদিকে যেমন তাওহীদের বিশ্বাস শাণিত হয়। তেমনি মানুষকে ইসলামের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের বিবেককে জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন।
৩. কুরবানী আমাদেরকে এছলাহে নিয়ত ও তাকওয়া শিক্ষা দেয়। আসলে নিয়ত ছাড়া সবকিছুই ভালো-খারাপ হতে পারে।নিয়তের গুণেই কাজ ভালো বা খারাপ হয়। আপনি অনেক টাকা দান করলেন, মাদরাসা বানালেন বা শহীদ হলেন, যদি আপনার এর দ্বারা দুনিয়াবি উদ্দেশ্য থাকে তাহলে এগুলো ভালো কাজ হিসেবে গণ্য হবেনা।
অন্যদিকে যদি আপাতদৃষ্টিতে একটা খারাপ কাজেও ভালো নিয়ত থাকে, তাহলে সেটাই ভালো কাজ হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ কুরবানীর বিষয়ে বলেছেন, আল্লাহ তোমাদের পশুর রক্ত গ্রহণ করবেননা। গোশত গ্রহণ করবেননা। গ্রহণ করবেন তাকওয়া।
গরু বা ছাগল যত বড়ই হোক, সেইটা গ্রহণ করবেননা। গ্রহণ করবেন তাকওয়া, সহি নিয়ত। সুতরাং আমাদেরও প্রতিটি কাজে নিয়ত সহি করতে হবে। কাজ যতই ছোট হোক, অবশ্যই, নিয়ত সহি করতে হবে।
৪. কুরবানি করার মাধ্যমে সবাই আল্লাহ তা’আলার ক্ষমতা ও আধিপত্য দৃঢ়চিত্তে মেনে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার তাওহীদের স্বীকৃতি ঘোষিত হয়।
৫. কুরবানী আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, শুধু নিজে আল্লাহর বিধান করলে চলবেনা। নিজের অধীনস্তদেরকেও আল্লাহর বিধান মানতে বলতে হবে। তাদেরকে মানতে বাধ্য করতে হবে, অন্যথায় ধর-পাকড় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবেনা।
নবীজি বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই তার অধীনস্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। ইবরাহীম আঃ তার ছেলেকে জবেহ করতে আদিষ্ট হয়েছিলেন। আদেশটা ছিল তার ছেলে সম্পর্কে। যদি ইসলাম শুধু ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে জবাই করার মত বিষয় নবী হয়ে ইবরাহীম আঃ আদেশ পালন করতেন না।অথচ তিনি বিনা সংশয়ে আদেশ পালন করেছেন।
এর থেকে বুঝা যায়, ব্যক্তির ক্ষেত্রে তো বটেই, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ের ইসলামি বিধানও পালন করতে হবে।পরিবার ও সমাজকে আল্লাহর বিধানের দাওয়াত দিতে হবে, চাপ প্রয়োগ করতে হবে।সংশয় ছাড়াই।অন্যথায় দায়িত্বশীলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
৬. কুরবানী আমাদেরকে সাম্য,সামাজিকতা ও আলাপ-আলোচনা করতে শিক্ষা দেয়। আসলে আমরা যেমন বলেছি, ইসলাম ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তো, ইসলাম কীভাবে সমাজ পরিচালনা করতে চায়? সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলাম সাম্য, সামাজিকতা ও আলাপ-আলোচনার গুরুত্ব দেয়। কেননা এই সুযোগ না দিলে, পরিণামে,ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম হয়।
অথচ ইসলাম বলে, সবাই আল্লাহর বান্দা, আর কারো বান্দা নয়।অতএব, আল্লাহর সাথে মানুষের বন্দেগির সম্পর্ক, মানুষে মানুষে সম্পর্ক ভাতৃত্বের।
ইবরাহীম আঃ ইসমাইল আঃকে জবেহ করার বিষয়ে দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি নবী, আদেশ প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তবুও, প্রয়োগের আগে তিনি ছেলের অনুমতি নিয়েছেন “বাবা আমি তো স্বপ্নে দেখেছি, আল্লাহ আদেশ করেছেন, যাতে তোমাকে জবাই করি, তুমি কি বল বাবা?” এই তো দায়িত্বশীলদের অধীনস্তদের সাথে সম্পর্ক, অনুমতি ও পরামর্শ!
হাদিসে আছে, প্রথমে কুরবানীর গোশত তিনদিনের বেশী জমিয়ে রাখার অনুমতি ছিলোনা। কেন ছিলোনা? যাতে মানুষের মধ্যে সামাজিক দায়বোধ গড়ে উঠে, নিজের ভাইকে ক্ষুধার্ত রেখে আপনি যে খেতে পারবেননা, এই শিক্ষা দেবার জন্যই তিনদিনের বেশী জমিয়ে রাখার অনুমতি ছিলোনা। পরে যখন সবার মধ্যে সামাজিক সাম্য ও দায়িত্ববোধ গড়ে উঠে, তখন, বেশীদিন জমিয়ে রাখার অনুমতি দেয়া হয়।
আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি, যেহেতু, ইসলাম ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই, সামাজিক যোগাযোগ,সম্পর্কে এবং দায় ও দায়িত্ববোধে ইসলামের শিক্ষার প্রতি লক্ষ্য রাখা অতীব জরুরি। আপনার সমাজ যদি ঠিক না থাকে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জুলুম।

Comments are closed.