আমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেন আল্লাহ তাআলা। এ রিজিকের অন্যতম অংশ হলো নগদ অর্থ। যা যোগান দিতে ঋণ করতে হয় কখনো কখনো। এ ঋণ যদি পরিশোধ করতে না পারি তাহলে তা পূরণের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছেই চাইতে হয়।
কারণ তিনি তা রাজ্জাক, পৃথিবীর সবার রিজিকদাতা। তারই প্রেরিত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণ থেকে মুক্তির জন্য কখন ও কিভাবে দোয়া করতে পারি তা বাতলে দিয়েছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম; যে উত্তমরূপে ঋণ পরিশোধ করে।’ কেউ যেন ঋণ পরিশোধে গড়িমসি না করে সে জন্য নবিজী বলেছেন, ‘ঋণ পরিশোধ না করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত।’
ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে যে দোয়া পড়া হয়
একবার এক লোক ঋণ পরিশোধের জন্য ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর কাছে কিছু সাহায্য চাইলেন। আলী (রা.) তাঁকে বললেন, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে কয়েকটি শব্দ শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আমি কি তোমাকে সেটা শিখিয়ে দেব? সেটা পড়লে আল্লাহ তোমার ঋণমুক্তির দায়িত্ব নেবেন। তোমার ঋণ যদি পর্বতপ্রমাণ হয়, তাহলেও।’
এরপর আলী (রা.) ওই ব্যক্তিকে কথাগুলো শিখিয়ে দিলেন, اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلاَلِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ ‘আল্লাহুম্মাক ফিনি বি হালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, হারামের পরিবর্তে তোমার হালাল রুজি আমার জন্য যথেষ্ট করো।
আর তোমাকে ছাড়া আমাকে কারও মুখাপেক্ষী কোরো না এবং তোমার অনুগ্রহ দিয়ে আমাকে সচ্ছলতা দান করো। (তিরমিজি: ৩৫৬৩; মুসনাদে আহমদ: ১৩২১)
হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন,
একদিন রসুল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে আনসারি একজন লোককে দেখতে পেলেন, যার নাম আবু উমামা। রসুল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘আবু উমামা! ব্যাপার কী, নামাজের সময় ছাড়াও তোমাকে মসজিদে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে?’ আবু উমামা বললেন, ‘ইয়া রসুলাল্লাহ! অনেক ঋণ এবং দুনিয়ার চিন্তা আমাকে গ্রাস করে রেখেছে।’ তখন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এমন কিছু কালিমা শিখিয়ে দেব, যেগুলো বললে আল্লাহ তাআলা তোমার চিন্তাকে দূর করে দিবেন এবং তোমার ঋণগুলো আদায় করে দেবেন।’ তিনি বললেন, ‘জি হ্যাঁ, ইয়া রসুলাল্লাহ! অবশ্যই বলুন।’ তখন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিম্নের দোয়াটি শিখিয়ে দেন এবং তা সকাল সন্ধ্যায় পড়তে বলেন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘উযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল-‘আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়াল-বুখলি ওয়াল-জুবনি, ওয়া দ্বালা‘য়িদ্দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজা-ল।
অর্থাৎ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুঃশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে। (সহিহ বুখারি: ২৮৯৩)
ঋণ পরিশোধের সময় কী পড়বেন?
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রবিআ আল-মাখযুমি (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুনাইন যুদ্ধের সময় তার কাছ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তার পাওনা পরিশোধ করেন। এরপর তাকে দোয়া করে বললেন-بارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْحَمْدُ وَالأَدَاءُ
‘বারাকাল্লাহু লাকা ফি আহলিকা ওয়া মালিকা; ইন্নামা ঝাযাউস-সালাফিল হামদু ওয়াল-আদাউ।’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ তাআলা তোমাকে তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। নিশ্চয়ই ঋণের প্রতিদান হলো- তা পরিশোধ করা এবং প্রশংসা করা।’ (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)
আর্থিক দুরবস্থায় পড়লে মানুষ ঋণ নিতে বাধ্য হয়। ঋণের টাকায় প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করে। তবে সাধ্যের বাইরে ঋণ দেওয়া-নেওয়া দুটিই ইসলাম নিষেধ করেছে। কারণ, তাতে সময়মতো ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা কমে যায়। এর ফলে ঋণদাতাকে যেমন হতাশাগ্রস্ত হতে হয়, ঋণগ্রহীতার আত্মমর্যাদাও ক্ষতির শিকার হয়।
এছাড়া ঋণ নেওয়ার প্রবণতা থেকে ভুল প্রয়োজনের সৃষ্টি হয় যা যেকোনো মানুষকে অর্থের সদ্ব্যবহার থেকে দূর রাখে এবং সর্বদা অভাবী বানিয়ে রাখে।
