লেখাপড়ায় হার না মানা যুবক জালালাবাদের আবদুল্লাহ, তিনি এখন আরবী প্রভাষক….

শিক্ষায় জাতীর মেরুদণ্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি লাভ করতে পারেনা। কারো জীবন সাত তলায় বেড়ে উঠা, কারও জীবনের শুরুটা হয় কাঁচা মাটির ঘরে, খালি পায়ে হেঁটে হেঁটেস্কুলে যাওয়ার গল্প দিয়ে। তেমন একজন কৃতিত্বের সাথে লড়াই করে বেড়ে সংগ্রামী টগবগে যুবক আব্দুল্লাহ আল হোসাইন।

কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার জালালাবাদ দক্ষিণ পালাকাটা গ্রামে ভোরে, কুয়াশার চাদরে ঢাকা গ্রামে তার বেড়ে ওঠা। মা ছিলেন একজন মাছ ব্যবসায়ী। বাবা থেকেও নেই। ঘরে ছিল আর্থিক টানাপোড়েন, কিন্তু অভাব কোনদিন টগ বগে যুবকটিকে দমিয়ে রাখতে পারেননি। স্বপ্ন ছিল সামনে এগিয়ে যাওয়া।

যেখানে অন্যরা খেলতো, শিখত অ আ ক খ, সেখানে আব্দুল্লাহর হাতে থাকত মাছের ঝুড়ি। তবু সে বই ছাড়েনি। বাজারে বসেই বই খুলে পড়তে থাকতো, এক কোণায় দাঁড়িয়ে। অভাব তাকে বই থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি, পারেনি তার চোখের স্বপ্নটাকে মুছে ফেলতে। পড়াশোনা করত ফাঁকে ফাঁকে। অসংখ্য বাধা পেরিয়ে, ঘরে ঘরে গিয়ে টিউশনি করে চালিয়ে গেছে নিজের পড়াশোনা। লেখাপড়ার ভাল ছিল বলে এলাকা মানুষেরা তাকেঁ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তার শিক্ষার আলোটা জ্বলে উঠেছিল একেবারে ছোটবেলা থেকেই। খোনকারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয় সে পথচলা।

২০১০ সালে পালাকাটা গোলজার বেগম দাখিল মডেল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অর্জন করেন জিপিএ ৫, যেন গ্রামজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল সেদিন। সেই ধারা বজায় রেখে ২০১২ সালেউ খুটাখালী তমিজিয়া ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষাতেও ছিনিয়ে আনেন জিপিএ ৫।

এটা কোন সহজ কৃতিত্ব ছিলনা। অর্জনের পেছনে ছিল লুকানো শত রাতের জেগে থাকা,ছিল ক্ষুধা নিয়ে পড়া, অশ্রু গোপন করে হাসা। এই সাফল্য কাকতালীয় নয়, এক নিরব,নিঃশব্দ যুদ্ধের গর্বিত বিজয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে অনার্স আর মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম শ্রেণি। এই তো সেই ছেলে, যে মাছের গন্ধ মাখা আঙুলে একদিন স্বপ্ন লিখে রাখত। আজ সেই হাতে ধরা দেয় অর্জনের কলম।

তার শিক্ষাজীবনের পথচলা থেমে থাকেনি বিশ্ববিদ্যালয়েই। জ্ঞানতৃষ্ণা তাকে নিয়ে গেছে দ্বীনি শিক্ষার গভীর স্রোতে। ফাজিল সম্পন্ন করেছেন ঐতিহ্যবাহী জামেয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে। কেবল বই নয়, মানুষ গড়ে তোলার পাঠও শেখানো হয়। আর কামিল করেছেন হাদিস বিভাগে, গহিরার প্রখ্যাত জামেউল উলুম মাদ্রাসা থেকে। যেখানে প্রতিটি হাদিসের শব্দে, প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি খুঁজেছেন আলোর পথ।

শিক্ষকতা জীবনের শুরুটা ছিল ২০১৭ সালে, মুহিউসসুন্নাহ মাদ্রাসায় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে। এরপর তানজিমুল মিল্লাতে কাটিয়েছেন মূল্যবান সময়। তিনি নাঙ্গলমোড়া শামছুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক। বর্তমানে একজন নতুন আলোচকও।

এই মানুষটি আমাদের শেখান, অভাব মানেই থেমে যাওয়া নয়। শুধু সাহস লাগে, নিজের উপর বিশ্বাস লাগে। তবেই একদিন আলো আসে। কষ্টের ঠিক পাশেই।
আব্দুল্লাহ আমাদের শেখান। জীবন যতই কঠিন হোক,যদি ইচ্ছা থাকে, যদি মন থেকে কেউ বলে ‘আমি পারবো’,তবে আলোর পথ ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়। আলো আসবে,শুধু হার না মানলে।

এনএএন টিভি / এম আবু হেনা সাগর

Share this news as a Photo Card