রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাকিবুল হাসান তিনবার হলে আসন পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। একজন অধ্যাপকের সুপারিশও ছিল। এরপরও তিনি শহীদ হবিবুর রহমান হলে উঠতে পারেননি। বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি মেসে থাকছেন। ভাড়া আড়াই হাজার, খাওয়াদাওয়া ও যাতায়াত মিলিয়ে মাসে তাঁর খরচ হচ্ছে চার হাজার টাকার মতো।
এই টাকা জোগাড় করা তাঁর জন্য কঠিন উল্লেখ করে শাকিবুল বলেন, ‘বাইরে থাকতে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়। রোজ রিকশাভাড়া দিতে হয়। হলে থাকলে খরচ ও চিন্তা দুই–ই কমত।’
নৃবিজ্ঞান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসবির হাসানের ভাগ্য অবশ্য শাকিবুলের মতো মন্দ নয়। তিনি আসন পেয়েছেন শাহ মখদুম হলে। তাঁর বড় ভাই একই হলে থাকায় আসন পাওয়া সহজ হয়েছে। তাসবির বললেন, ‘হলে ভাড়া মাত্র ১০০ টাকা। বাইরে থাকলে মাসিক ভাড়া দুই-তিন হাজার টাকা হতো।’
অথচ দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। বাস্তবে এখন বিশ্ববিদ্যালয়টির ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হচ্ছে।
সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন সামনে রেখে আবাসনসংকটের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা আবাসনসংকট দূর করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
শিক্ষার্থী কত, হল কয়টি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই। তখন স্থায়ী ক্যাম্পাস ছিল না। রাজশাহী কলেজ, বড়কুঠিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ক্লাস ও অফিস চলত। শুরুতে শিক্ষার্থী ছিলেন মাত্র ১৬১ জন। ১৯৫৮ সালে নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়ার কাজ শুরু হয়, আর ১৯৬৪ সালে মতিহারের ৭৫৩ একর জায়গায় বর্তমান ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়।
এখন ১২টি অনুষদের আওতায় ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তাঁদের জন্য আছে ১৭টি আবাসিক হল ও একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি। এর মধ্যে ছেলেদের জন্য ১১টি, মেয়েদের জন্য ৬টি হল। আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে থাকেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা। সব মিলিয়ে আবাসনসুবিধা আছে মাত্র ৯ হাজার ৬৭৩ জনের জন্য। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর ৩২ শতাংশ হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২৫ বছরে বিভাগ বেড়েছে ২৩টি, নতুন অনুষদ হয়েছে ৭টি। একই সময়ে ৪টি নতুন ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। এর গত ১৫ বছরে ১৪টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে।
২০১৫ সালে চারুকলাকে পূর্ণ অনুষদে রূপান্তর করে এর অধীনে ৩টি বিভাগ চালু হয়। জীববিজ্ঞান অনুষদে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ এবং ফিশারিজ ও ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদও এই সময়ে গড়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভস থেকে জানা যায়, ২০০০ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন প্রায় ২১ হাজার, এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজারে। অর্থাৎ ২৫ বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৯ হাজার। কিন্তু এ সময়ে নতুন হল হয়েছে মাত্র ৩টি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি ছাত্রী হলে আসনসংকট আরও প্রকট। প্রতিটি হলে গণরুম চালু আছে, যেখানে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। এতে পড়াশোনা ও ঘুম দুই–ই ব্যাহত হয়। রোকেয়া হলের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আর্থিক অবস্থার কারণে মেসে থাকতে পারিনি। হলে আসতে হয়েছে শিক্ষকদের সুপারিশে। কিন্তু এখানে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হয়।’
বেগম খালেদা জিয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শারমিন হামিদ জানান, তাঁর হলে বরাদ্দ আসন ১ হাজার ২০০। আসনসংকটে অর্ধেক শিক্ষার্থীই জায়গা পান না। বিকল্প হিসেবে গণরুম চালু করে বাড়তি ১০০ ছাত্রীকে রাখা হচ্ছে। অন্য ছাত্রী হলগুলোরও একই অবস্থা।
বিগত সরকারের শেষ মেয়াদে হলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) হাতে। প্রাধ্যক্ষরা কার্যত আসন বরাদ্দ দিতে পারতেন না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলে আসন পেতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ঘুষ’ দিতে হতো ছাত্রলীগের নেতাদের। অভিযোগ আছে, যাঁরা স্বাভাবিক নিয়মে আসন নিতেন, তাঁদের নির্যাতন করে বের করে দেওয়া হতো। অনেক কক্ষ দখল করে রাখতেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের অছাত্র নেতা-কর্মীরা। হলে রাজনৈতিক ব্লক গড়ে ওঠে। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। প্রশাসনের দাবি, এখন মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
২০১৮ সালে ১০ তলার শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও শেখ হাসিনা হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। কামারুজ্জামান হলের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। আগামী ডিসেম্বরে সেখানে শিক্ষার্থীরা উঠতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আসন থাকবে এক হাজার। শেখ হাসিনা হলের ধারণক্ষমতা হবে ৮০০ জনের। তবে এটির কাজ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। আগামী জুনে এটির কাজ শেষ হতে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এস এম ওবায়দুল ইসলাম জানান, কামারুজ্জামান হলে ৫১৯টি কক্ষ থাকবে, প্রতিটিতে দুই আসন। হাউস টিউটরসহ প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী জায়গা পাবেন। শেখ হাসিনা হল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হলে আরও ৮০০ শিক্ষার্থী যুক্ত হবে। তবে এতে সমাধান আসবে সীমিত পরিসরে, কারণ মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় এই আসন সংখ্যা নগণ্য।
রাকসু নির্বাচন সামনে রেখে আবাসন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন প্রার্থীরা। এ বিষয়ে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব বলেন, ‘ভর্তি হওয়ার পর থেকেই যেন সব শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারেন—এ দাবিকে আমরা গুরুত্ব দেব।’
ছাত্রদল–মনোনীত জিএস প্রার্থী নাফিউল ইসলাম (জীবন) বলেন, ‘আবাসনের সুবিধা না থাকায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী প্রচুর সমস্যায় ভোগেন। আমরা নির্বাচিত হলে নতুন হল নির্মাণের দাবি জানাব এবং যেস শিক্ষার্থী এই সুবিধা পায় না, তাদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থার জন্য জোরালো দাবি জানাব।’
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘আবাসন ভাতা’ দেওয়ার দাবি জানিয়ে শিবির–সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজা। তিনি বলেন, আবাসনসংকট নিরসন না হওয়ায় ভাতা দিতে হবে। তাঁরা নির্বাচিত হন বা না হন, তাঁরা এই দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন।
‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী তাসিন খান হলে আসন না পাওয়া নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নারী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করলে নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারকে জানাব।’

2 Replies to “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন ৬৮% শিক্ষার্থী, গুনতে হয় বাড়তি টাকা”
Comments are closed.