ভাঙা-গড়ার জীবন নদীপা‌রের মানু‌ষের

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের পূর্ব গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা শওকত আলী। বয়স ৬০ বছর ছুঁই ছুঁই। স্ত্রী ছলিমা বেগমের (৫০) সঙ্গে ৩০ বছরের দাম্পত্য জীবন তার। দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হলেও বারবার ভেঙেছে ‘ঘর-সংসার’।

সম্প্রতি আবারও উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে। শুরু হয়েছে নদ ভাঙন। এবারও শওকত-ছলিমার ঘর ভেঙে নিয়েছে সর্বনাশা ব্রহ্মপুত্র।

ছলিমা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদীভাঙনে ফসলি জমি, বসতবাড়ি চলে গেলেও সরকারি ক্ষতিপূরণ পাইনি। এক সময় কয়েক বিঘা ফসলি জমি থাকলেও এখন বাড়ি করার জায়গা নেই।’ব্রহ্মপুত্র তীরের বা‌সিন্দা আদম আলী (৬০) ব‌লেন, ‘আমার জীবনে অন্তত ১৫ বার বা‌ড়ি ভাঙ‌ছে।এবারে নদীভাঙন শুরু হলে সবাই বাড়ি ভেঙে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ২০ বছরের পুরাতন ভিটা রেখে যেতে মায়া হচ্ছে। তাই এখনো যাইনি। কিন্তু না গিয়ে উপায় নেই। ভাঙতে ভাঙতে নদী আঙিনায় এসেছে। যেকোনো দিন ভেঙে নেবে।’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬  থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেলায় ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের ভাঙনে ১৫ হাজার পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছেন। এ বছর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ৪৪৭টি বস‌তবা‌ড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

প্রতিবছর গড়ে কুড়িগ্রাম জেলার সাড়ে চার শতাধিক এবং দ্বীপচরে গড়ে দুই হাজার পরিবার নদীভাঙনে তাদের বসতি হারান।

এ ছাড়া রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী উপজেলার সোনাপুরে শতাধিক পরিবার রাজারহাট উপজেলায় তিস্তার ভাঙনে ৬৩টি পরিবার এবং ফুলবাড়ী উপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙনে ৬টি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছে। এসব পরিবার অন্যের জমিতে ও বাঁধের রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে।

খোঁজ খবর নি‌য়ে জানা গে‌ছে, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর ভগবতীপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ওই চরের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের পূর্ব গোবিন্দপুর এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় ভাঙন দেখা গেছে। গত ১৫ দিনে নদীভাঙনে ওই এলাকার প্রায় ২৫টি বসতবাড়ি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। এসব নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলো কেউ অন্যের বাড়িতে আবার কেউ কেউ আবাসন প্রকল্পের মাঠে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ওই এলাকায় দুটি মসজিদ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উলিপুর উপ‌জেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সেতুটি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন বসতবাড়ি নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে।

এদি‌কে বৃহস্প‌তিবার দুপু‌রে তিস্তা নদী ভাঙন‌রো‌ধে মানববন্ধন ক‌রে‌ছে উপ‌জেলার বজরা ইউনিয়‌নের সাদুয়াদামার হাট বগলাকুড়া এলাকার বা‌সিন্দারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পাঁচটি পয়েন্ট ভাঙন ঝুঁকিতে আছে। ইতিমধ্যে আমরা তিনটি পয়েন্টে নদী ভাঙন রোধে কাজ চলমান রয়েছে। পাঁচগাছি ও যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুটি পয়েন্টে দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে।

পাঁচগাছি ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল বাতেন সরকার বলেন, ‘গত কয়েকদিনের নদীভাঙনে ৮টি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। ইতিমধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করে এসেছি। ওই এলাকায় ভাঙন চলমান আছে।’

রাজারহাট উপ‌জেলার চর গতিয়াসাম এলাকার উমর আলী, সাইফুল ইসলাম, ছামিরুল ইসলাম ব‌লেন, তিস্তা নদীর পা‌নি কমার স‌ঙ্গে স‌ঙ্গে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। দেখ‌তে‌ দেখ‌তে প্রায় ২৫‌টি বা‌ড়ি ভাঙ‌নের শিকার হ‌য়েছে।

 

এনএএন টিভি

Share this news as a Photo Card