এ কেমন বর্বরতা, কোথায় এর শেষ

অস্ত্রোপচারে রুমা বেগমের ছেলের জন্ম হয়েছিল। নতুন অতিথির আগমনে পরিবারটি আনন্দে ভাসে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আনন্দ ছাপিয়ে আসে শোক।

গত ১৪ আগস্ট শরীয়তপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে জন্মের পরই নবজাতকটির শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। চিকিৎসক নবজাতককে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন।

মোশারফ মিয়া নামের একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক ঢাকা থেকে রোগী নিয়ে শরীয়তপুরে গিয়েছিলেন। নবজাতকের বাবা নূর হোসেন অল্প খরচে অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়া করেছিলেন।

কিন্তু স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সচালকদের দাবি ছিল, বেশি ভাড়া দিয়ে তাঁদের অ্যাম্বুলেন্সে যেতে হবে। এ কারণে স্থানীয় চালক সবুজ দেওয়ান অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে চাবি নিয়ে চালককে মারধর করেন। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয় নবজাতকটির।

 

‘আমার পোলারে খুন করার অধিকার তারারে দিসে কেডা’

‘আমার পোলারে খুন করার অধিকার দিসে কেডা’

গত ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় কুমিল্লা নগরের অশোকতলা বিসিক শিল্পনগরী এলাকার একটি কারখানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে মো. সায়েমকে (২৪) হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ছেলের লাশের অপেক্ষায় থাকা সায়েমের বাবা রিকশাচালক আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমার পোলায় যদি অন্যায় করে, তারে জেলে দিত। …কিন্তু আমার পোলারে খুন করার অধিকার তারারে দিসে কেডা?’

এসব ঘটনার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কোনো কোনো ঘটনায় সরকার বিবৃতি দিয়েছে। কোনো কোনো পরিবারকে পুলিশি পাহারা দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু তারপরও দেশে একের পর এক অমানবিক ঘটনা ঘটে চলছে।

বর্বরতার সাক্ষী সমাজ

রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের (স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) সামনে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙারি পণ্যের ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)।

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী, নিহত ব্যক্তির স্বজন, মামলার এজাহার ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবরণে জানা যায়, গত ৯ জুলাই লাল চাঁদকে রড, ভারী লাঠি ও সিমেন্টের ব্লক-ইট দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। হামলাকারীরা লাল চাঁদকে মারধর করে বিবস্ত্র করেন। তাঁর শরীরের ওপর উঠে লাফান কেউ কেউ। পরে লাল চাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা উল্লাস করেন।

তারাগঞ্জে গণপিটুনির আগে হাত জোড় করে এভাবে বাঁচার আকুতি জানান প্রদীপ লাল (বাঁয়ে)। নিজের পরিচয় বলছিলেন রুপলাল (ডানে)

ঘটনার নিন্দা জানিয়ে রাজনৈতিক নেতারা বক্তব্য-বিবৃতি দেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত পৈশাচিক ও ন্যক্কারজনক ঘটনাটির দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।’

এ ঘটনা আইয়ামে জাহেলিয়াতের নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম।

বাঁচার আকুতি কেউ শোনেনি

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুরে চোর সন্দেহে বেঁধে পেটানো হয় জুতা সেলাই করা রূপলাল দাস ও ভ্যানচালক প্রদীপ লালকে। কয়েক শ মানুষের ভিড়ে তাঁদের বাঁচার আকুতি কেউ শোনেনি। পুলিশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটে যায়।

খান মো. রবিউল আলম, যোগাযোগবিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক

গত ৯ আগস্ট রাতে ঘটনাটি ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫ মিনিট ২১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বাঁচার জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন রূপলাল ও প্রদীপ। স্থানীয় বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ভ্যানের ওপর যখন তাঁদের রাখা হয়, তখনো তাঁরা জীবিত। চারপাশে কয়েক শ মানুষ। পুলিশের চার সদস্য ভ্যানটি ঘিরে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে জনতাকে থামানোর চেষ্টা করছেন। শোরগোল শুরু হলে পিটুনিতে অর্ধমৃত এই দুজনকে রেখে সরে যায় পুলিশ। আশপাশের কেউ কেউ তখন বলছিলেন, ‘পুলিশ পালাইছে।’

২০১৯ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন তাসলিমা বেগম। তিনি মেয়েকে ভর্তি করানোর তথ্য জানতে একটি স্কুলে গিয়েছিলেন।

২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, গণপিটুনির নামে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় মানুষ হত্যার লাইসেন্স দেওয়া হবে সমাজের যেকোনো মানুষের জন্য আতঙ্ক ও অনিরাপত্তার কারণ। প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়।

এনএএন টিভি