কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল

কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করছে অন্তর্বর্তী সরকার

সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন

সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে অবশেষে জমি ও ফ্ল্যাট খাতে কালোটাকা সাদা করার বিদ্যমান সুযোগ বাতিল করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, এই সিদ্ধান্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কার্যকর হতে পারে।

বাজেটে রাখা হলেও বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত

বর্তমানে জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়ে নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালোটাকা) বৈধ করার সুযোগ রয়েছে। এই সুবিধা পূর্ববর্তী সরকার রেখে যায় এবং প্রস্তাবিত বাজেটেও তা অব্যাহত ছিল। তবে বাজেট ঘোষণার পর ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষিতে সরকার নীতিগতভাবে এই সুযোগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।দেশে আগে থেকেই আয়কর আইনের তফসিলের মাধ্যমে এত দিন কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত টাকায় ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে করহার কয়েক গুণ বাড়িয়ে সুবিধাটি বহাল রাখার প্রস্তাব করেন। এর পর থেকেই তা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা শুরু হয়। ফলে সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেছে। সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব নেতাদের এক আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

অর্থ উপদেষ্টার ইঙ্গিত ও এনবিআরের অবস্থান

বাজেট ঘোষণার পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, “এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা বাতিলের চিন্তা করছি।” একই সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান-ও এই বিষয়ে সুর মিলিয়ে বলেন, সরকার চাপের মুখে রয়েছে।

আবাসন খাতের দাবিও প্রত্যাখ্যান

গত সোমবার আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের একটি প্রতিনিধিদল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়ার নেতৃত্বে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তারা জমি ও ফ্ল্যাট খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগটি বহাল রাখার দাবি জানায়। তবে উপদেষ্টা স্পষ্ট জানান, তিনি ব্যাপক চাপের মুখে আছেন এবং এই সুবিধা বাতিল করা হচ্ছে

আগের সরকার সুযোগ দিলেও ফল মেলেনি

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার কালোটাকা সাদা করার সুবিধা দিয়ে আসছে। উদ্দেশ্য ছিল এই অর্থকে মূল অর্থনীতির ধারায় আনা। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে খুব কম অর্থই বৈধ হয়েছে। বরং এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং অসৎদের পুরস্কৃত করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা এসে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বাতিল করেছিল। কিন্তু এই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা প্রথম বাজেটেই নতুন করে করহার বাড়িয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখার প্রস্তাব করেন।

সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের দেওয়া চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেটে এক বছরের জন্য নগদ টাকার পাশাপাশি জমি, ফ্ল্যাট-প্লটসহ স্থাবর সম্পদ কেনার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সর্বোচ্চ করহারের চেয়ে কম কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার এ সুবিধার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা ছিল। এ সুযোগকে অনৈতিক ও সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক।

টিআইবির কড়া সমালোচনা

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই ব্যবস্থাকে সরাসরি দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এই সুযোগ অপরাধকে সুরক্ষা দেয়। আমরা আশা করি সরকার এখান থেকে সরে আসবে।”দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, কর নিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে অপরাধকে। টিআইবির (টিআইবি) প্রধান নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা আশা করব, এর থেকে সরকার সরে আসবে।’

এন এ এন টিভি