ইরান–ইসরায়েল সংঘাত

  • ইরান–ইসরায়েল সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা

ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান তীব্র সংঘাত এক সপ্তাহে গড়ালেও বিশ্লেষক ও মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।এই যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে।
কারণ, এইসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ ইসরায়েলকে দেওয়া হয়েছে অথবা মার্কিন বাহিনীর নিজস্ব প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায়।

ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে টানা প্রাণঘাতী হামলা ও পাল্টা হামলা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কা বাড়ছে যে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই অঞ্চলের বিশেষত্ব হলো, এটি বিশ্বের তেল ও গ্যাসের অন্যতম মূল উৎপাদনকেন্দ্র। ফলে আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধে কখন কে ছারখার হয় বলা মুশকিল। আগামী ২৪ ঘণ্টায় এর কোনো পূর্বাভাস নেই। কারণ ‘মূলনায়ক’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার নিজেই এই ‘বিপজ্জনক’ ইঙ্গিত দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে।

কানাডার জি-সেভেন সম্মেলন শেষের আগেই ফেরার পথে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে বলেন, ‘আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বোঝা যাবে ইসরাইলের হামলার গতি কমবে না বাড়বে।’ সে হিসাবে আগামী ২৪ ঘণ্টা কতটা ভয়ংকর হবে, কতটা লোমহর্ষক হবে তার ধারণা নেই।
ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস আগামী শুক্রবার পর্যন্ত েন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবারের আরেক পোস্টে প্রথমবারের মতো সেই গোমরই ফাঁস করলেন ট্রাম্প। বললেন, ‘ইরানের আকাশ এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে।’

তারপর বলেন, ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কোথায় লুকিয়ে আছেন আমরা জানি। কিন্তু তাকে আমরা এখনই হত্যা করব না।’

তারপরই আবার বলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে ইরানকে।’ অর্থাৎ যুদ্ধ এখন আর ইসরাইলের সঙ্গে নেই। নিঃসঙ্গ ইরানের প্রতিপক্ষ বিশ্ব বিশৃঙ্খলার খলনায়ক যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। সে হিসাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কী ঘটতে যাচ্ছে, কী হবে তা পুরোটাই ধোঁয়াশায়!

একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সংঘাত আমাদের অস্ত্র মজুদের ওপর বড় ধাক্কা দিচ্ছে।’ তবে তিনি এটাও যোগ করেন, ‘সময় ইরানের বিরুদ্ধে কাজ করছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়।’

গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছে লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা প্রতিরোধে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইয়েমেনে হুথিদের নেতৃবৃন্দ ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে অভিযান শুরু করে, যেখানে বিপুল পরিমাণ এসএম-২, এসএম-৩ ও এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। গত মাসে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধও মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডারকে ব্যাপকভাবে খালি করেছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিওর ইস্ট পলিসির সামরিক ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক মাইকেল আইজেনস্টাড বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংকট থাকলেও, আমাদের অস্ত্র মজুদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত আরো বড় কারণে—যদি চীন কিংবা কোরীয় উপদ্বীপে সংকট সৃষ্টি হয়, সেখানে গোলাবারুদের ব্যবহার আরও বেশি হবে।’

বুধবার মার্কিন সেনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার সতর্ক করে বলেন, ‘এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক জাতীয় নিরাপত্তা মুহূর্ত।
ইরানের হুমকির মুখে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহায়তা বৃদ্ধি
ঢাকা, ১৯ জুন ২০২৫: ইরানের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মুখে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ২,০০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০০ ইতোমধ্যে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে।

ইরান ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মতো সস্তা প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে দুটি ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (THAAD)’ ইউনিট মোতায়েন করেছে, যা অতীতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল বর্তমানে তার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ পুনরায় পূরণে সমস্যায় পড়ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একটি বহুতলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে রয়েছে:

অ্যারো-২ ও অ্যারো-৩: দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত

ডেভিড’স স্লিং: মাঝারি পাল্লার হুমকি প্রতিহত করতে

আয়রন ডোম: স্বল্প পাল্লার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে

এই সকল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি অংশই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকরা
ইসরায়েলের বিশেষজ্ঞ আইজেনস্টাড জানান, ‘ইসরায়েল দ্রুতগতিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।’ তবে ইসরায়েলি অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস হওয়ায় হুমকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে ইরানের সামরিক ও শিল্প অবকাঠামো ক্ষতির মুখে পড়লে, তাদের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া লাভজনক নাও হতে পারে।’

এই পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো উত্তেজনা ছড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের মন্তব্য: “যুদ্ধ চাই না, তবে প্রস্তুত আছি”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, এখনো ইরানে সরাসরি হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, ‘আমি যুদ্ধ করতে চাই না। তবে যদি যুদ্ধ করা এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, তাহলে যা করার দরকার, তাই করতে হবে।’

এন এ এন টিভি