তিন বছর বিদ্যুৎ-পানিহীন, আগাছা খেয়ে বাঁচা ওলেশকিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি

রাশিয়ার দখল করা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওলেশকিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অবরুদ্ধ শহরটির বাসিন্দাদের অনেকেই বেঁচে থাকার তাগিদে রান্না করে খেয়েছেন বাগানের আগাছা ।

চরম খাদ্যসংকটের মধ্যে আটকে পড়া বাসিন্দাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো এবং তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছে।

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমিত পরিসরের এ যুদ্ধবিরতি মেনে চলা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে এ যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা হয়েছে। গত শুক্রবার ত্রাণ সরবরাহ ও বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

খেরসন অঞ্চলের সম্মুখসারির কাছে অবস্থিত ওলেশকি শহরটি ভৌগোলিকভাবেও বিচ্ছিন্ন। একদিকে দিনিপ্রো নদী, যার অপর পারে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অবস্থান; অন্যদিকে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ। ফলে শহরটির বাসিন্দাদের জন্য বাইরে যাওয়া কিংবা সেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিবিসিকে শহরটির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা চরম ক্ষুধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং সেখান থেকে চলে যেতে চান। তবে যুদ্ধবিরতি কতক্ষণ কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এক বাসিন্দা বলেন, “রাশিয়ার মানবিকতায় আমার বিশ্বাস নেই।”

তিন বছর ধরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংকট
যুদ্ধের আগে ওলেশকির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর প্রথম দিকেই শহরটি দখল করে নেয় রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে শহরটি ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ শিশু।

শহরটিতে কোনও দোকান খোলা নেই। গত তিন বছর ধরে সেখানকার বাসিন্দারা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ সেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

শহর থেকে বের হওয়ার সড়কগুলোতে স্থলমাইন থাকায় পায়ে হেঁটে পালিয়ে যাওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুদ্ধবিরতির আওতায় শহরটিতে ত্রাণ পৌঁছানোর পাশাপাশি সড়কগুলো থেকে মাইন সরিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে।

তবে বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে অনেক বাসিন্দা এখনও আটকে আছেন। এক নারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, স্থলমাইনে পা পড়ে আহত হওয়ার পর দুটি অস্ত্রোপচার শেষে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শুক্রবারের পরিকল্পিত সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

ওই নারী বলেন, “আমাকে আর কত দিন সেখানে থাকতে হবে, তা জানি না।”

নিরাপদে চলে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ
যুদ্ধবিরতির খবর বাসিন্দাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও তাদের উদ্বেগ কাটেনি। সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, কোথায় গিয়ে নাম নিবন্ধন করতে হবে- এমন অনেক বিষয় শুরুতে স্পষ্ট ছিল না। কেউ কেউ জানতে চাইছেন, সঙ্গে পোষা প্রাণী নেওয়ার সুযোগ থাকবে কি না। আবার অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেলে ভবিষ্যতে তাদের কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

বিশেষ করে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় চলে যাওয়ার পর তাদের আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি রুশ কর্তৃপক্ষ তাদের মুঠোফোন ও অনলাইন কার্যক্রম পরীক্ষা করে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের কোনও প্রমাণ খুঁজতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে। এমন সন্দেহের ভিত্তিতে তাদের আটক করে নির্যাতন করা হতে পারে বলে ভয় পাচ্ছেন বাসিন্দারা।

ওলেশকিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এক ব্যক্তি বিবিসিকে জানিয়েছেন, সরিয়ে নেওয়ার সময় আবার গোলাগুলি শুরু হতে পারে বলে তার স্বজনেরা আশঙ্কা করছেন। তাদের ভয়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের দায় কোনওভাবে ইউক্রেনের ওপর চাপানো হতে পারে।

শহরটির বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন। সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা অনিয়মিত। আবার রুশ বাহিনীর প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকে নিজেদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। ফলে যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা
গত মাসে ক্রেমলিন স্বীকার করেছিল, ওলেশকিতে পরিস্থিতি ‘সংকটজনক’ হয়ে উঠেছে এবং সেখানে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহে সমস্যা রয়েছে। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির সামরিক বাহিনী কাজ করছে। একই সঙ্গে সংকটের জন্য কিয়েভকে দায়ী করেছিল মস্কো।

এ পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস জানায়, মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের প্রস্তুতি হিসেবে মস্কোর স্থানীয় সময় ভোর চারটা (গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা এবং বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা) থেকে দিনিপ্রো নদীর অপর পারে অবস্থিত ইউক্রেনের খেরসন শহর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ বন্ধ করা হয়েছে।

ইউক্রেনের পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধবিরতি শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ইউক্রেনের আলোচক দলের প্রধান হিসেবে তিনি জানান, তার দেশ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে।

গত সপ্তাহে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছিল, “দুই দেশের সামরিক নয়, এমন বেসামরিক নেতারা যৌথভাবে ওলেশকির বাসিন্দাদের বাড়িতে যাবেন এবং তাদের কী পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করবেন।”

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প তার পূর্বসূরিদের অনেকের তুলনায় জনসমক্ষে কম উপস্থিত থাকলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট মোকাবিলায় যুক্ত হয়েছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি চিঠি লিখে বিশ্বজুড়ে শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

অন্যত্র হামলা অব্যাহত
ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকায় হামলা বন্ধ হয়নি। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানী কিয়েভে রুশ হামলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে একজন নিহত এবং ১৪ জন আহত হন।

অন্যদিকে, রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক শহরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।

ওলেশকির বাসিন্দাদের জন্য যুদ্ধবিরতি ত্রাণ পাওয়ার এবং নিরাপদে শহর ছাড়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে তাদের মুক্তি কতটা নিশ্চিত হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর থাকে এবং পরিকল্পিত মানবিক সহায়তা ও সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম বাস্তবে কতটা সফল হয়, তার ওপর।

 

 

এনএএন টিভি

Share this news as a Photo Card