লেবু ফসলের সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পে করণীয়

সারা পৃথিবীতেই সাইট্রাস লেবু জাতীয় ফল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল। এই ফসলের উৎপাদনের দিক থেকে পৃথিবীর ফলসমূহের মধ্যে এর স্থান ২য়, কিন্ত আন্তজাতিক বাণিজ্যের দিক থেকে এ ফলের স্থান ১ম ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশের এলাচী লেবু, কাগজী লেবু উপযোগী ।

এ দেশে লেবু জাতীয় ফলের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। লেবু উৎপাদন বাড়াতে এর রোগ-বালাই এর লক্ষণসমূহ চিনে দমন করতে হবে।

প্রতিকারঃ ডিমসহ পাতা সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। এছাড়া, লেবুর পাতার ছাতরা পোকা ক্ষতির কারণ হতে পারে ।

যেমন কাগজী লেবু , জাম্বুরা , এলাচী লেবু ইত্যাদি গাছে ছাতরা পোকা আক্রমন হলে তা দমন করতে হবে ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ী, ঢাকা ২০১৯ সালে জুলাই মাস থেকে লেবু জাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। প্রকল্পের এই কাজ চলবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে ৩০টি জেলা ১২৩ টি উপজেলায় এর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন,

‘উপজেলায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী লেবু চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্প কার্যক্রম চলছে।’

কৃষি সমৃদ্ব অঞ্চল শেরপুরে এবার বীজ বিহীন নতুন জাতের বারো মাসী লেবু চাষে কৃষক- কৃষাণীর সাফল্য দেখা দিয়েছে।

স্বল্প শ্রম ও এই ফসলের উৎপাদন খরচে কয়েকগুণ লাভ হওয়ায় ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ পর্যাপ্ত রস ও সুঘ্রাণ যুক্ত এ লেবু আবাদ শেরপুর সদরের চরের কিছু অংশ

নকলা ও সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতি উপজেলার পাহাড়ী অঞ্চল নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ী অঞ্চল, শ্রীবরদী উপজেলার পতিত জমিতে এ লেবুর চাষ দিনে দিনে বাড়ছে।

উঁচু, মাঝারি উঁচু জমির বেলে বা বেলে দোঁ-আশ মাটিতে উৎপাদিত এলেবু জাতীয় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

ফলে ঐ লেবু চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক, কৃষাণীরা।

যুগ যুগ ধরে কাগজী লেবু, পাতি লেবু, বাদামী লেবু চাষ হয়ে আসলেও আধুনিক উৎকর্ষের যুগে সেই তালিকায় যোগ হয় হাইব্রিড জাতীয় লেবু।

আবার হাইব্রিজ জাতীয় লেবুর পর যোগ হয় বীজবিহীন (সিডলেস) বিনা-১ ও বারী-৪ লেবু।

কৃষি সমৃদ্ধ কোন কোন এলাকায় বারী-৪ লেবুর মুখ দেখে প্রায় ১০ বছর আগে।

সাবেক কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী শেরপুর জেলার কৃষকদেরকে পরামর্শ দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক ক্ষুদ্র চাষীদের বীজবিহীন লেবু চাষে উৎসাহিত করেন।

সে উৎসাহে নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা, বাছর আলগা, রামপুর, বানেশ্বর্দী, পোলাদেশী,

বাউসা, চর অষ্টধর, নারায়নখোলা, কাজাইকাটা, পাঠাকাটা সহ জেলায় প্রায় ৭০টি গ্রামে ২ শতাধিক কৃষক লেবু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠে।

রোপণের বছর বাদে প্রতি বছর একবার ডালপালা, ছাটা, মাটি কোপানো, তিন মাস পর পর নিড়ানি দিতে হয়, ৩/৪ বার সেচ দিতে হয়।

৩ থেকে ৪ মাস অন্তর অন্তর সামান্য জৈব সার গাছে গোড়ায় ছিটিয়ে দিতে হবে।

একর জমি লেবু চাষ করলে বছরে খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায়।

এছাড়া নিজেরা কলম তৈরি করলে বাহিরে বিক্রি করা যায়। একেকটি লেবুর চারা ২০ থেকে ৫০ টাকায বিক্রি হয়।

লেবু চাষ অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভবান বলে অন্য ফসল ছেড়ে দিয়ে লেবু চাষে ঝুঁকছেন কৃষক/ কৃষাণীরা।

সারা বছর লেবু বিক্রি করে পরিবারে ব্যয় নির্বাহসহ ছেলে মেয়েদের আর্থিক যোগান দিয়ে পারিবারিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন অনেক পরিবার।

শেরপুর সদরে একজন চাকুরীজীবি কৃষক লেবু চাষ করে উৎপাদিত লেবু বিক্রি করেছেন ১৩ লাখ টাকা।

শেরপুর সদর কৃষি অফিসার কৃষিবিদ পিকন কুমার সাহা জানান,

তার আওতাধীন চরপক্ষীমারীর এক কৃষক মনিরুজ্জামান মনির লেবু চাষ করে এখন শতাবাগ সফলতার স্বপ্ন দেখছেন।

তার দেখাদেখি লেবু চাষে উৎসাহিত হয়ে উঠছেন আরো অনেকেই। চন্দ্রকোন সরজমিনে গেলে চাষী লুৎফর রহমান, মোস্তাক আহম্দে বলেন

‘১৭ শতক জমিতে লেবু চাষ করে ১ বছরে ১ লাখ টাকা লাভ করেছেন।’

লুৎফর রহমান জানান,

‘৭৫ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে ঐ জমিতে লেবুর চারা রোপন করে করে ৩০৬ টি।’

‘প্রথম বছর তার আনুসঙ্গিক ব্যয় হয় ১ লাখ টাকা, পরে বছর ২ লাখ টাকার লেবু বিক্রি করেছেন।’

লেবু চাষ প্রসঙ্গে নালিতাবাড়ীর কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শরিফ ইকবাল বলেন,

‘নালিতাবাড়ী উপজেলার আওতাধীন লেবু জাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প এর আওতায় কেউ ৫ শতাংশ, ১০, ১৫, ২০ ,৪০, ৫০ শতাংশ করে ৩০ টি প্রদর্শনী করেছেন।’

এ বিষয়ে জেলা কৃষির উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আশরাফ উদ্দিন বলেন,

‘আগে কৃষকরা লেবু চাষে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। বাড়ির আঙ্গিনায় ২/৪ টি গাছ লাগিয়েই শেষ করতেন। এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লেবু চাষ দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে চলেছে।’ জেলার প্রায় ৫ শত থেকে ৭শত একর জমিতে বীজ বিহীন লেবু চাষ হচ্ছে।

ঝিনাইগাতি উপজেলার কৃষি অফিসার কৃষিবিদ হুমায়ূন করিব বলেন,

‘পতিত জমিতে ও পাহাড়ী উঁচু জমিতে লেবু চাষ করে অনেক কৃষক এখন লাভবান হচ্ছেন।’

‘তার লেবু তোলে পাইকারী বিক্রি করেছেন। লেবু চাষীদের নিয়মিত পরমার্শ ও সেবা দেওয়া হচ্ছে।’

চাষী আবুর হাসেম জানান,

‘তার ৭০ শতাংশ জমিতে লেবু চাষ করে মাসে আয় হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।’

‘রেবু চাষ পদ্ধতি খুবই সহজ কারণ সারা বছর তা পরিচর্যা করতে হয় না। শুধু ২/৩ সেচ ও সার দিলেই চলে।’

প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ ফারুক আহমেদ বলেন,

‘বাংলাদেশের ৩০ টি জেলার ১২৩ টি উপজেলার আওতাভূক্ত চাষীরা এপ্রকল্পের সুবিধা ভোগ করে লেবু চাষে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন।’

‘সারাদেশে ৫শত কোটি টাকার লেবু উৎপাদন হবে বলে কৃষিবিদরা ধারনা করছেন।’

দেশের ৭টি বিভাগের ৩০ টি জেলার ১২৩টি উপজেলায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলে আসছে।

প্রকল্প এলাকায় লেবু জাতীয় ফল চাষ নিবিড়করণ ও প্রায় ১০-১৫% ফলন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।

এলাকায় অতিরিক্ত ৪০,০০০ মে.টন মাল্টা ও কমলা উৎপাদনের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়। মাধ্যমে।

প্রকল্প এলাকায় মাল্টা ও অন্যান্য লেবু জাতীয় ফল উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার প্রকল্পের এলাকায় বাইরের ২৫% কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা।

প্রকল্প এলাকার ২০টি সরকারি নার্সারিতে লেবু জাতীয় ফলের মাতৃবাগান স্থাপন ও চারা উৎপাদনের দক্ষতা প্রায় ২৫% বৃদ্ধি করা।

• প্রকল্প এলাকায় প্রদর্শনীভুক্ত কৃষকদের বিশেষ করে মহিলা কৃষকদেরসহ অন্যান্য কৃষকদের আয় ১০% বৃদ্ধি করা ও ৮-১০% বেকারত্ব দূর করা।

• সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট ও কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ৫০০০টি পুরাতন বাগানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন ১৫-২০% বৃদ্ধি করা।

প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত পটভূমি সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় ফল বাংলাদেশে সব বয়সী মানুষের কাছেই অত্যন্ত জনপ্রিয়।

তাছাড়া, প্রতিটি পূর্ণ বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খাওয়া প্রয়োজন।

১৬ কোটি জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন ১২০০০ কেজি বা ১২ মে.টন ভিটামিন সি প্রয়োজন।

সে হিসাবে প্রতি বৎসর শুধুমাত্র ভিটামিন সি এর প্রয়োজন ৪৩৮০ মে. টন। ভিটামিন সি এর উৎস হিসাবে মাল্টা, কমলা, লেবু, বাতাবিলেবু, কাগজী লেবু প্রভৃতি।

প্রকল্প পরিচালক ড: ফারুক আহমদ প্রাণবন্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন এ প্রকল্পের আওতায় কৃষকরা যেন প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের উৎপাদিত লেবু জাতীয় ফল বিক্রি করে লাভবান হন এবং বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিনত হতে পারেন ।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবীরতা ও বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের আওতায় সবজি চারা উৎপাদন ব্যাপকভাবে সারা ফেলেছে।

জানা গেছে ৬০ টি উপজেলার ৬টি জেলার মধ্যে এ প্রকল্পের কার্যক্রম চলে আসছে।

এ প্রকল্পের আওতায় টমেটো,মরিচ, ফুলকপি,বাধাকপি,বেগুন চারা উৎপাদন করেন কৃষকরা।

নকলা উপজেলায় পৌরসভার অধীন ফরিদুল ইসলাম নামে এক কৃষক তার নিজের ১০ শতাংশ জমিতে পলিনেট হাউজ স্থাপন করে সবজি উৎপাদনে বাজিমাৎ সৃষ্টি করে চলেছে।

প্রকল্পের আওতায় স্প্রে মেশিন মাটি বহনের জন্য ট্রলি পেয়েছেন তিনি। এক বছরে ২ লাখ টাকা লাভবান হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো: জিয়াউর রহমান তাকে সহযোগিতা করেছেন।

নকলা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী তাকে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন

‘বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের টাঙ্গাইল কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর এ প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে।’

এনএএন টিভি