যুক্তরাষ্ট্রের ২০ শতাংশ শুল্ককে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’ ও ‘কূটনৈতিক সাফল্য’ বলছেন৷ তবে কোনো কোনো কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ মনে করেন, চুক্তির শর্তগুলো জানা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আরোপ করা শুল্ক হার ২০ শতাংশে কমিয়ে আনাকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘ঐতিহাসিব চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন “এটা সুস্পষ্ট এক কূটনৈতিক সাফল্য।”
তবে কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, আপাতত স্বস্তি ফিরলেও সার্বিকাভাবে শঙ্কামুক্ত হতে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে তা জানা জরুরি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অবশেষে স্বস্তিতে বাংলাদেশ। বিশ্লেষক, পোশাক শিল্পের মালিক ও কূটনীতিকরা মনে করছেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ একই অবস্থানে থাকায় আপাতত বাংলাদেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শঙ্কা কাটলো। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরিপোশাকের একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বড় গন্তব্য। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় আসে তৈরি পোশাক থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বিষয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত চুক্তিতে ট্যারিফসহ তিনটি শিডিউল দেয়ার কথা। শিডিউলগুলো পেলে সেগুলোর ওপর কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করব। ৯ তারিখের সময়সীমার বিষয়টি উল্লেখ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিডিউলগুলো দিতে তাদের আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। এ কারণে বাংলাদেশ এখনো চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। ৯ এপ্রিল পাল্টা শুল্ক স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় পাল্টা শুল্ক আরোপ হয়ে যাবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেছেন, “উই হোপ নট” (আমরা আশা করছি তা হবে না)।’
মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে আরো বলেন, ‘আমরা চুক্তির খসড়ার ওপর এরই মধ্যে আমাদের মতামত পাঠিয়েছি। এ মতামত তাদের পাঠানো চুক্তির খসড়ার বিপরীতে লিখিতভাবেই জানানো হয়েছে। এর ভিত্তিতে একটি মিটিং হয়েছে। আরেক দফা মিটিং হবে ৯ জুলাই। সেই বৈঠকে আমি অনলাইনে যুক্ত থাকব। উভয় পক্ষ সব বিষয়ে একমত হলে দ্রুতই চুক্তি সম্পন্ন হবে।’
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ট্যারিফ হার ছাড়াও চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বা দিক নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। তারা বলছেন, এ চুক্তির অনেক শর্ত কোনো সার্বভৌম দেশের পক্ষে মানা কঠিন। ক্ষেত্রবিশেষে এ বিষয়গুলো ট্যারিফ হারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটা বাংলাদেশকেও অনুসরণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো একটি দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটাও বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে হবে। কোনো দেশের ওপর যদি তারা অতিরিক্ত কোনো শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকেও তা করতে হবে।
এছাড়া নির্দিষ্ট একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ জড়াতে পারবে না—এমন শর্তও দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এ বিষয় নিয়ে ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্র সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ যেন সম্পৃক্ত না হয়—এমন কিছু শর্ত থাকতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে।
চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষাবিষয়ক চুক্তিতে জড়ানো যাবে না—এমন কোনো বিষয় চুক্তির খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে এ রকম কোনো বিষয় চুক্তিতে লেখা নেই। অর্থাৎ নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে চুক্তির খসড়ায় কিছু বলা হয়নি। চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট হয়েছে। কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শর্তে সম্মত হওয়া যায়নি বলে বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো এগ্রিমেন্ট হচ্ছে না। যেসব বিষয়ে বাংলাদেশ সম্মত হতে পারবে না, সে বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে স্পষ্ট মতামত পাওয়া যায়নি। ৯ তারিখের বৈঠকে বা বৈঠকের পর হয়তো এসব বিষয়ে কিছু বোঝা যাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রটি আরো জানিয়েছে, চুক্তির সব বিষয়ে যদি বাংলাদেশ সম্মত না হয় তাহলে তা স্বাক্ষর হবে না। আর যদি সম্মত হয়, তাহলে হয়তো হবে। কিছু বিষয় আছে যেগুলোয় বাংলাদেশ সম্মত হতে পারেনি। সেগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র একমত না হলে চুক্তি স্বাক্ষর হবে না। যদি উভয় পক্ষ সম্মত হয়, তাহলে স্বাক্ষর হবে। ৯ তারিখ তাদের একটা সময়সীমা। কিন্তু সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার তারিখ ৯ জুলাই না। এ তারিখের পরেও আলোচনা করা যাবে।
অন্যদিকে এ প্রতিবেদন লেখার সময়ই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাল্টা শুল্ক কার্যকরের সময়সীমা বৃদ্ধির সংবাদ প্রকাশ হয়।
গত ২৬ জুন ওয়াশিংটনে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খালিলুর রহমান। ৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটি সভা হয়। ওই সভায় যোগ দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি জানিয়েছিলেন, ট্যারিফ আরোপ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অটুট রাখা নিয়ে সংবেদনশীল।
৩ জুলাইয়ের সভা নিয়ে শুক্রবার রাতে শেখ বশিরউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেটার কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করছি। আমি যুক্তরাষ্ট্রকে বলার চেষ্টা করেছি, তারা যেন আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ইনকম্পিটেন্স তৈরি না করে। আমরা তাদের একটা কম্পিটিটিভ সোর্স। অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে যদি আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, সেটা তাদের জন্য ভালো না, আমাদের জন্যও ভালো হবে না। দিন শেষে ভোক্তারাই উচ্চমূল্য পরিশোধ করবেন। আমরা আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রস্তাব করেছি। তাদের ট্যারিফ কী হবে, সেটা তারা বিস্তারিত দেবে।’
