ইরানের সামরিক নেতৃত্ব পরিবর্তন
গত শুক্রবার সকালে ইরান এক ভয়াবহ বিদেশি হামলার শিকার হয়, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী আক্রমণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইসরায়েলের এই অভিযানে নিহত হয়েছেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় পাঁচজন সামরিক কমান্ডার। তাদের মৃত্যুর পরপরই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নিযুক্ত করেন।ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ও পাল্টা হামলার মধ্যে ইরান নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
নিহত কমান্ডাররা হলেন:
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ বাঘেরি
আইআরজিসি’র কমান্ডার-ইন-চিফ হোসেইন সালামি
খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের প্রধান গোলাম আলি রশিদ
আইআরজিসি এরোস্পেস ফোর্সের প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ
এবং অন্যান্য সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা
এই ঘটনার পরপরই আলী খামেনি বলেন:
“যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সহকর্মীরা অবিলম্বে দায়িত্ব নিয়ে দেশকে রক্ষা করবেন।”
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন নিয়োগের ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে নতুন রক্ত সঞ্চার করেন।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন:
নতুন নিয়োগ ও রদবদল
১. মোহাম্মদ পাকপুর – নতুন আইআরজিসি কমান্ডার-ইন-চিফ
সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম অভিজ্ঞ সদস্য। ১৬ বছর আইআরজিসসির স্থলবাহিনী পরিচালনা করেছেন। গেরিলা ও ক্লাসিক যুদ্ধ উভয়ক্ষেত্রেই দক্ষ। সাবেরিন ইউনিট গঠনের মূল পরিকল্পনাকারী।
২. আলী শাদমানি – খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের প্রধান
ইরানের সর্ববৃহৎ ও সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড সেন্টারের দায়িত্ব পেয়েছেন। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং আইআরজিসিতে দীর্ঘদিনের সেবা তাকে এই পদে এনেছে।
৩. মাজিদ মুসাভি (হোসেইন মুসাভি ইফতেখারি) – আইআরজিসি এরোস্পেস ফোর্সের প্রধান
পূর্বে ডেপুটি হিসেবে কাজ করেছেন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতে সরাসরি অবদান রয়েছে তার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা একজন কৌশলবিদ।
৪. আমির হাতামি – ইসলামিক রিপাবলিক আর্মির নতুন কমান্ডার
পূর্বে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। এই পদে এসে তিনি আবদুর রহিম মুসাভির স্থলাভিষিক্ত হন। মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন।
৫. আবদুর রহিম মুসাভি – নতুন সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ
এই প্রথম, একজন সেনাবাহিনী কর্মকর্তা আইআরজিসি’র বাইরে থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বহু সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিলেন। তিনি ৮ বছর আর্মির প্রধান ছিলেন।
পদোন্নতি পাওয়া সব কমান্ডার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের ব্যাপারে তাঁদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। ইরানজুড়ে এখন কেবল শোনা যাচ্ছে, ‘আপনারা যুদ্ধ শুরু করেছেন, আমরা শেষ করব।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটিসহ আবাসিক ভবনে আঘাত হেনেছে। হামলায় কমপক্ষে ১৪ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রদবদল শুধুমাত্র নতুন নেতৃত্ব আনা নয়, বরং ইরানের সামরিক কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আইআরজিসির বাইরে থেকে চিফ অব জেনারেল স্টাফ নিয়োগ তার অন্যতম উদাহরণ। এটি ইঙ্গিত করে যে, ইরান হয়তো রেগুলার আর্মি এবং আইআরজিসির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত উত্তেজনার মধ্যে এই পরিবর্তনগুলিকে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে, এরোস্পেস এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ইউনিটগুলিতে নতুন নেতৃত্ব আনা হয়েছে যা ভবিষ্যতের হুমকিগুলোর জন্য প্রস্তুতির লক্ষণ।
ইরানের তেল ও গ্যাস সংস্থা, পেট্রোকেমিক্যাল, স্টিল ও অটোমোবাইল কারখানা এবং বিভিন্ন আবাসিক ভবনগুলোতে ইসরায়েলের আক্রমণের জবাব দিতে তেহরান রোববার ভোর পর্যন্ত ইসরায়েলের শক্তি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
ইরান বলেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ২৫ শিশুসহ ২২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। রোববারও তেহরানজুড়ে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
