৬ষ্ঠ হিজরিতে রমজানের ১৩ তারিখে ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হলো হজরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ। তবে, এর সঠিক তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু ভিন্নমত রয়েছে। তবুও, এটি ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
হজরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ
হজরত উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে ইসলামের অন্যতম কঠোর বিরোধী ছিল। তিনি একদিন রসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন, কিন্তু পথে জানতে পারেন যে তার নিজের বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব এবং তার স্বামী সাঈদ বিন জায়েদ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে তিনি তাদের বাড়িতে যান এবং তাদেরকে প্রহার করেন। পরে যখন তিনি কুরআনের কিছু আয়াত শুনলেন (সূরা ত্বাহা থেকে), তখন তার হৃদয়ে পরিবর্তন আসে।
এরপর তিনি সরাসরি রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে মুসলমানরা প্রকাশ্যে ইবাদত করতে শুরু করে এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি পায়। হজরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ: ঐতিহাসিক ঘটনা ও দলিল
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ইসলামের অন্যতম মহান খলিফা ও সাহাবী। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ইসলামের শত্রু থেকে অন্যতম শক্তিশালী রক্ষক হয়ে ওঠার এই ঘটনা মুসলমানদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।
ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট। ইসলামের প্রাথমিক যুগে হজরত উমর (রা.) ছিলেন নবী (সা.)-এর অন্যতম কঠোর বিরোধী। তিনি মুসলমানদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালাতেন এবং ইসলামের প্রসার ঠেকানোর জন্য কাজ করতেন।
একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি রওনা হন, কিন্তু পথে নুয়াইম ইবনে আবদুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে থামিয়ে বলেন, ”
তুমি আগে তোমার নিজের পরিবারের খবর নাও, কারণ তোমার বোন ও তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করেছে।
কুরআনের আয়াত শুনে হৃদয়ে পরিবর্তন
উমর (রা.) ক্ষুব্ধ হয়ে তার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবনে জায়েদের (রা.) বাড়িতে যান। সেখানে তিনি তাদের কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনতে পান। তিনি প্রবল ক্রোধে তাদের মারধর করেন।
এরপর যখন তাঁর বোন রক্তাক্ত অবস্থায় বললেন,
হে উমর! তুমি আমাদের যা খুশি করো, কিন্তু আমরা ইসলাম ছাড়ব না!” তখন উমরের মন কিছুটা নরম হয়ে আসে এবং তিনি বলেন, “তোমরা কী পড়ছিলে, আমাকে দেখাও!
তারা তখন তাকে কিছু আয়াত শোনান, যা ছিল সূরা ত্বাহা-এর প্রথম অংশ: طه مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى إِلَّا تَذْكِرَةً لِمَنْ يَخْشَى তা-হা। আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি তোমাকে কষ্টে পড়ানোর জন্য। বরং এটা তার জন্য উপদেশ, যে ভয় করে। (সুরা ত্বাহা: ১-৩)
এই আয়াতগুলো শোনার পর তাঁর হৃদয়ে পরিবর্তন আসে, এবং তিনি সরাসরি নবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল। উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর সাহাবিরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কাবা শরিফে গিয়ে নামাজ আদায় করেন।
রসুলুল্লাহ (সা.) তার ইসলাম গ্রহণের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! ইসলামকে শক্তিশালী কর উমর ইবনুল খাত্তাব বা আবু জাহলের মধ্যে একজনের দ্বারা। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৮৩)
ইসলামের ইতিহাসে উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের গুরুত্ব
১. মুসলমানরা প্রকাশ্যে ইবাদত করার সাহস পায়। ২. কুরাইশদের মাঝে ইসলামের প্রতি ভয় সৃষ্টি হয়। ৩. ইসলামের শক্তি বাড়তে থাকে এবং মুসলমানদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ৪. উমর (রা.) পরবর্তীতে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হন এবং এক বিশাল ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
তথ্যসূত্র-
১. ইবনে হিশাম, সিরাতুন্নবি (সা.) – এতে উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
২. সহিহ বুখারি (৩৮৬১) – নবী (সা.)-এর দোয়া এবং উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে।
৩. তিরমিজি (৩৬৮৩) – রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়।
৪. মুসনাদ আহমদ (১/১৭) – উমর (রা.) কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন তা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
