শেরপুরে বাড়ছে দিন দিন কলার আবাদ, সন্তুষ্ট কৃষকরা

স্বল্প খরচ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এবং কলাচাষ লাভজনক হওয়ায় শেরপুর জেলা ও গারো পাহাড়ি উপজেলাগুলোয় দিন দিন বাড়েছে কলার আবাদ। সেই সাথে কলা চাষে আশানুরূপ ফলন এবং অভাবনীয় লাভ পেয়ে কৃষকরা ও বেজায় খুশি। কলা চাষে সফলতা পেয়ে অনেকই এখন বেশ স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। সেই সাথে শেরপুরের উৎপাদিত নানা জাতের কলার চাহিদা ও খ্যাতি এখন দেশজুড়ে।

বানিজ্যিক ভাবে সরবি, সাগর, চম্পা, আনাইজে বা কাঁচকলা, তুলইডে, ভিমাইডে ইত্যাদি জাতের কলা চাষ ও বিকিকিনির সঙ্গে জড়িয়ে সচ্ছলতা ফিরেছে শেরপুর জেলা- উপজেলার বেশ কয়েক শত কৃষক পরিবারের। মাটি ও আবহাওয়া কলা চাষের উপযোগী হওয়ায় এক বার চারা রোপণ করে কোন কোন কলা বছরে ৩ বার বিক্রি করতে পেরে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। কৃষকরা ইনকিলাবকে বলছেন, কোন কোন কলা এক বার চারা রোপণে তিন বার কলার ফলন পাওয়া যায়। তাতে খরচ কম- লাভ পাওয়া যায় বেশি। তাই চাষিরা উৎসাহিত হয়ে কলাচাষে ঝুঁকে পড়েছেন।

 

শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি অঞ্চলে সর্বাধিক কলার চাষ হয় বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাধ হয় শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়ি অঞ্চলে। তার পরই ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীত কলা চাষ বেশি হয়।

‘ঝিনাইগাতী উপজেলার ডেফলাই,ভালুকা,গান্দিগাঁও বাঁকাকুড়া, রাংটিয়া সহ পাহাড়ি গ্রামাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য হারে কলার আবাদ হচ্ছে বলে দৈনিক ইনকিলাবকে জানান ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন। ঝিনাইগাতীর উল্লেখিত গ্রামেগুলোয় অনেক বাড়ির পাশেই শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন জাতের কলার বাগান।

‘কলা চাষিরা জানান, এসব গ্রামের মাঠে মাঠে কলার বাগানে প্রচুর পরিমাণ কলার চাষ হয়েছে। এছাড়া গারো পাহাড় অঞ্চলের ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলার মাঠে মাঠে ও কলার চাষ হচ্ছে।’

 

’৯০ দশক থেকে শেরপুরে বানিজ্যিকভাবে কলাচাষ শুরু হলেও বর্তমানে কৃষকদের কাছে কলা আবাদ এখন একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল। স্থানীয় কলার কদর ও দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব জাতের কলা কাঁচা অবস্থায় গাড়ো সবুজ হলেও পাকলেই দেখতে হলুদ হয়ে যায়।

 

‘শেরপুর জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় কলার চাষ হয়েছে ১০০২ হেক্টর জমিতে। কলার দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকরা। আগামীতে কলাচাষ আরও বেড়ে যাবে বলে জেলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের ধারণা।’

‘ঝিনাইগাতী উপজেলার ভালুকা গ্রামের কলাচাষি আজাহার জানান, স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে কলার চারা আমদানি করে এক বিঘা জমিতে চাষ করেছিলেন। সেই এক বিঘা কলায় অল্প টাকা খরচ করে ভালো লাভ হয়। পরে গেল দুই বছর থেকে সরবি, সাগর ও চম্পা জাতের কলার আবাদ করি। এ জাতের কলা বড়, সুস্বাদু এবং রং সুন্দর হওয়ায় দেশের সব জেলাতেই কলার চাহিদা অনেক বেশি। প্রথম বারেই খরচের টাকা বাদ দিয়ে লাভ হয়েছে দ্বিগুণ। ওই জমি থেকে এখনও দুবার কলা পাওয়া যাবে। কলাচাষ লাভজনক হওয়ায় গান্দিগঁও গ্রামের কলাচাষি মিজানুর রহমান মিজান, আশ্রাফুল আলম ও বাবলু কলা চাষে তারা ভাল লাভের মূখ দেখেছেন। আগামীতে তারা আরো বেশী জমিতে কলা চাষ করবেন বলে জানান।’

 

‘কলা ব্যবসায়ীরা বলেন, এখানকার উৎপাদিত কলার চাহিদা অনেক বেশি এবং দামও ভালো। বাজারেতো বটেই বাগান থেকেই বেশীরভাগ কলা কিনে আনতে হয়। কলা ব্যবসায়ীরা জানান, স্থানীয় কলা থেকেই আমারা পরিবারের যাবতীয় সাংসারিক খরচ চালাই।’

‘গারো পাহাড় সীমান্তের কলা চাষের ব্যাপারে সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ ফরহাদ হোসেন দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, কলা চাষ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত এবং এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মতো মাধ্যম হতে পারে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় কলা চাষে দ্রুত ভালো লাভ পাওয়া যায়। উপযুক্ত জাত ও সঠিক পরিচর্যা করলে সারা বছর কলা উৎপাদন করা সম্ভব। যা নিয়মিত আয়ের উৎসের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

তিনি আরো বলেন,পানামা ও সিকাটোগার মতো মারাত্মক রোগ কলার ফলন ও গুণগত মান হ্রাস করে। ক্রমাগত চাষাবাদের ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়, যা ফলনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়াও প্রাকৃতিক দূ্ুর্যোগ ও বন্য হাতির আক্রমণের কারণে ফসলহানি হলে চাষীরা লোকসানের সম্মুখীন হতে পারেন। তবে একই জমিতে ২৪ মাসের বেশি কলা চাষ না করাই উচিত। কারণ তাতে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায়। এসব বিষয়ে ও চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

‘ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আশ্রাফুল আলম রাসেল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, কলা চাষ অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় চাষিরা কলার চাষে বেশ ঝুকে পড়েছেন। সাগর, সবরি, চাঁপা, চিনিচাঁপাসহ বিভিন্ন ধরনের কলার চাষ হচ্ছে এখানে। সম্প্রতি কৃষি বিভাগ তরকারি খাওয়ার জন্য উন্নত জাতের কাঁচকলা (আনাইজে কলা) চারা সরবরাহ ও চাষ করার জন্য চাষিদের উদ্বুদ্ধ করছেন। তিনি আরো বলেন, কলাচাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ দিনভর মাঠে থাকছেন। চাষিদের কলা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের কলায় স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কারবাইড ও বিষ স্প্রে না করার পরামর্শ দেন তিনি।

 

এনএএন টিভি