রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি কুকুর নিধনের ঘটনা ঘটে। এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়। ১২টি কুকুর মেরে ফেলা হয়েছে মর্মে দাবি জানান স্থানীয় পশুপ্রেমীরা। বিষয়টি নিয়ে তখন একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে সেই বারিধারা ডিওএইচএসেই বিড়ালকে খাবার দেওয়ার জেরে নিরাপত্তারক্ষীদের হামলায় নারীসহ অন্তত চারজন বাসিন্দা গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে বারিধারা ডিওএইচএস পার্কের কাছে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী বাসিন্দা আকিবুর রহমান খান জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা কয়েকজন মিলে পার্কের পাশে থাকা পথবিড়ালদের খাবার দিতে গেলে ডিওএইচএস পরিষদের অন্তত ২০ জন নিরাপত্তারক্ষী একযোগে তাদের ওপর হামলা চালায়। তার স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে বেধড়ক পেটানো হয় এবং চুল ধরে টানাটানি করা হয়। একই ঘটনায় রাফিদ নামের এক যুবককে গুরুতর জখম করা হয়েছে।
আকিবুর নিজের ওপর চালানো সহিংসতার বর্ণনা দিয়ে আকিবুর আরও বলেন, “রক্ষীরা আমার মুখে ও পিঠে লাথি মারে এবং পায়ে শক্তভাবে আঘাত করে, এতে আমার পায়ের হাড়ে ফাটল (হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার) ধরেছে।” ঘটনার আকস্মিকতায় বাসিন্দারা ভিডিও করার চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনগুলো ছিনিয়ে নেয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশের টহল দল উপস্থিত হলেও ভুক্তভোগীদের কেড়ে নেওয়া ফোন উদ্ধারে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই-এমন অজুহাতে তারা তাৎক্ষণিক কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ডিএমপির গুলশান বিভাগের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. নাজমুল হক বলেন, বারিধারা ডিওএইচএসে বিড়ালকে খাবার দেওয়া নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বাসিন্দাদের মনোমালিন্যের ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা খবর পেয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, দু’পক্ষই শুক্রবার বিকালে সেখানকার সোসাইটির মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করে নিবে। এ ঘটনায় এখনো কেউ কোনো অভিযোগও করেনি। তবে অভিযোগ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অব বারিধারা ডিওএইচএস’-এর সদস্যরা জানান, প্রাণি কল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী কোনো আবাসিক এলাকা থেকে স্বাধীন বেওয়ারিশ প্রাণি জোরপূর্বক অপসারণ বা ক্ষতিসাধন করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
নিরাপত্তারক্ষীদের এই বেআইনি শারীরিক লাঞ্ছনা ও ফোন দখলের ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, ইতোমধ্যে এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই নিরাপত্তারক্ষীদের এমন আচরণের সমালোচনা করে মানবিকতা ও প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
আশরাফ হোসেন নামের এক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, ‘বেওয়ারিশ প্রাণীকে খাবার দেওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না। বরং ক্ষুধার্ত একটি প্রাণীকে খাবার দেওয়ার মধ্যে মানবিকতাই প্রকাশ পায়। এভাবে কাউকে মারধর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
দিদারুল ইসলাম নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘মানুষের পাশাপাশি প্রাণীদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। যারা অসহায় প্রাণীদের খাবার দেন, তাদের ওপর হামলা না করে বিষয়টি মানবিকভাবে সমাধান করা উচিত।’
পেহনাজ উপমা মন্তব্য করেন, ‘বিড়ালগুলো তো কারও ক্ষতি করছে না। তাদের খাবার দেওয়া নিয়ে এমন সহিংসতা কেন? একটি আবাসিক এলাকায় মতের বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান মারধর বা ভয় দেখিয়ে হতে পারে না।’
সাদিক কবির লিখেছেন, ‘প্রাণীর প্রতি দয়া দেখানো অপরাধ নয়, বরং এটি মানবিকতার পরিচয়। ভিডিওতে যে ধরনের হামলার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’
প্রাণীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন এভ্রিথিং ফর এনিমেল এর কর্ণধার ফাতিমা খান বলেন, আবাসিক এলাকার সবাই কিন্তু প্রাণীবিদ্বেষী নন; অমানবিক মানুষের সংখ্যা কম হলেও তারা প্রভাবশালী। আমরা তো বলি- পছন্দ না হলে ভালো না-ই বাসলেন, অন্তত ওদের ওপর অত্যাচার কইরেন না, পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েন না বা গরম পানি ঢেলে চামড়া পুড়িয়ে দিয়েন না!
যেখানে ফিডাররা খাবার দেওয়ার পর এলাকা নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার রাখেন, সেখানে জায়গা নোংরা হওয়ার অজুহাত তুলে হামলা করা কোনো সমাধান নয়। সমস্যার সমাধানে আমরা সবসময় প্রস্তুত। স্থান নির্ধারণ, কামড়ালে দায়িত্ব নেওয়া, সরকারি সুবিধায় বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেওয়া এবং স্পে-নিউটার বা অপারেশন করানোর জন্য আমরা দিনরাত মুখিয়ে আছি।
আইনি ঝামেলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অভাব আর পরে প্রাণীদের ওপর প্রতিশোধমূলক অত্যাচারের ভয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশে যেতে চান না। তাই আইন নয়, আমরা আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান চাই। সাবেক কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল নাগরিকদের নীতি-নিয়মের পাশাপাশি আরও মানবিক হওয়া জরুরি।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বারিধারা ডিওএইচএসে বেশ কয়েকটি কুকুর নিধনের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয় সেসময়। ১২টি কুকুর মেরে ফেলা হয়েছে মর্মে দাবি জানান স্থানীয় পশুপ্রেমীরা। তখন বিষয়টি নিয়ে একাধিক গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে। কুকুর নিধন না করার জন্য ডিএনসিসি ছাড়াও বিভিন্ন মানবিক সংগঠন বিভিন্ন সময় চিঠি দেয় ডিওএইচএস বারিধারা পরিষদকে। কিন্তু পরিষদ এতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বিড়াল ইস্যুতে উত্তপ্ত হলো বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা।
