চাঁদের আলোতে গ্রামীন জনপদের পুকুর ঘাট, বাড়ির আঙিনায় বা নিরিবিলি পরিবেশে চিরচেনা সেই পুথিপাঠের আসর প্রায় বিলুপ্তি। দিন বদলের যুগ আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় এটি হারিয়ে যাচ্ছে।
আগেকার দিনে জোছনা রাতে গ্রামবাংলায় মানুষ মেতে উঠতো নির্মল আনন্দের পুথি পাঠ, কবিগান, পালাগানের আসর জমিয়ে রাখত।সে সময় গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের বিনোদনের উৎসাহ ছিল, পুথি পাঠের আসর। পুথি হলো গাছের পাতা তুলট কাগজে হাতে লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। রাতের বেলায় যে বাড়িতে পুথির পাঠের আয়োজন হতো সে বাড়ির উঠোনে শীতল পাটি বা চাটা মাদুর বিছিয়ে গোল করে বসতো। জোছনারাত না থাকলে কুপি বাতি, হারিকেন জালিয়ে রাখত। আশেপাশের দু-চার গ্রাম কিংবা বাড়ির লোক এসে জড়ো হতো। বিশেষ করে কোনো বাড়ির মেজবান, জেয়াফত কিংবা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের পান সল্লাতের পরে জমে উঠত পুথি পাঠের আসর। সে সময় পুথি পাঠ ছিল এক নির্দোষ ও অনাবিল বিনোদন অনুষ্ঠান, যে আসরে পিতা পুত্র, বয়োজ্যেষ্ঠ নারী পুরুষ সবাই বসে পুথির রস উপভোগ করে আনন্দে সুধা পান করত।
একজনে পাঠ করতেন অন্যজন পুথি ব্যাখ্যা করে বলতেন। যিনি ব্যাখ্যা করতেন তাঁকে অনেকে পণ্ডিত বলত। পুথি পাঠ করার জন্য অত বেশি বিদ্যা জানা লাগত না। ছোটোবেলা থেকে পুথি সংগ্রহ করে পণ্ডিতদের মুখে মুখে শুনে পুথি মুখস্থ করতো। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতেন। রাতভরে চলত পুথি পাঠের আসর। কখন যে রাত ফুরিয়ে যেত টের পেতনা। মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসত। পুথির আসরের লোকজন বুঝতে পারত, যে সুবহ সাদেক হয়েছে। পুথি পাঠের আসর ভাঙত। এখন আর সে-দিন নেই।
কক্সবাজার ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বাঁশঘাটা নামক স্থানে কজন বয়োবৃদ্ধ মিলে সুরেলা কন্ঠ পূথিপাঠ করতো প্রতিনিয়ত একটি সময়ে। এখন আর দেখা যায়না। বয়োবৃদ্ধ আহমদ হোসন জানান, একসময় ঈদগাঁও উপজেলার কয়েকটি স্থানে পুথিপাঠ চলতো। সেসব স্মৃতি এখন আর চোখে পড়েনা।
যারা পুথির আসর জমাতেন তাঁদের মধ্যে অনেকে না ফেরার দেশে চলে গেছে। আগেকার দিনের মতো ঘটা করে এখন পুথি পাঠের আসর বসে না’।কালের বিবর্তন, সংস্কৃতির গ্রাসে ও আধুনিকতার ঝাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পুথি পাঠের আসর অনেকটা বিলুপ্তির পথে। বর্তমান সময়ে পুথি পাঠের আসরকে ডিঙিয়ে হরেক রকমের গায়কের গানের তালে তালে বিমোহিম করে তুলছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে।
এনএএন টিভি / এম আবু হেনা সাগর
