নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি কীভাবে টিকে আছে

“নিষেধাজ্ঞা তবুও টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি: রোধযুদ্ধে তৈরি ‘রেজিস্টেন্স ইকোনমি’”

নিষেধাজ্ঞা  সত্বেও, ইরান-ইসরায়েলের পাল্টা হামলার পর রণনৈতিক ও অর্থনৈতিক রকেট! কীভাবে এ ক্ষমতা ধরে রেখেছে ইরান?

ইরান ও ইসরায়েলের ওপরচাপাতালি হামলার বিনিময়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল বেড়েই চলেছে—ইরান কীভাবে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া চালাচ্ছে? আর তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্ত?
মূলকথা ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূলে পরিণত হয়। বিশেষত তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ইরানের বিপ্লবীদের হামলার পর পরিস্থিতির ঘোরতর অবনতি হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে দেশটির ওপর।

“নিষেধাজ্ঞা তবুও টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি: রোধযুদ্ধে তৈরি ‘রেজিস্টেন্স ইকোনমি’”
“নিষেধাজ্ঞা তবুও টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি: রোধযুদ্ধে তৈরি ‘রেজিস্টেন্স ইকোনমি’”

মাঝে বারাক ওবামা এসব নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করলেও ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম জমানায় আবারও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়। ফলে পশ্চিমা জনমনে ধারণা ছিল, ইরান হয়তো বেশি সময় পাল্টা আক্রমণের ধার বজায় রাখতে পারবে না। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে এখন পর্যন্ত ইরান পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে। খবর আল-জাজিরা ও বিবিসির।

১. প্রাকৃতিক সম্পদের শক্তি
ইরান বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস মজুদে প্রথম সারির দেশ।ইরানের অর্থনীতির ভিত যতটা না নীতিনির্ভর, তার চেয়ে বেশি নির্ভরশীল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। বিশ্বে সবচেয়ে বড় গ্যাস ও তেলের মজুদদারদের মধ্যে অন্যতম দেশটি হচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য বলছে, ২০২১ সালেও গ্যাস মজুতের দিক দিয়ে ইরান ছিল দ্বিতীয় আর তেলে তৃতীয় বৃহত্তম।

২. নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চতুর বিকল্প
ক্রিপ্টো, হুন্ডি ও প্রতিবেশী বাণিজ্য: আফগান, সিরিয়া, তুরস্ক, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে গোপন চ্যানেল চালিয়ে যাচ্ছে ।

অলাভজনক অথচ কার্যকর রপ্তানি: কৃষিপণ্য, কার্পেট, জাফরান ও শিল্পপণ্য বার্ষিক রপ্তানি চালু রেখেছে ।

৩. স্বনির্ভরতা ও প্রযুক্তি
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ঘাঁটি গড়া বাজার উদ্যোগে ইরান নিজস্ব অস্ত্র, ন্যানো-টেক এবং অবকাঠামোতে অংশের সহায়তায় অনেক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হয়েছে ।

৪. সামরিক বাজেট ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক
সামরিক বাজেটে এক বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ১০.৩ বিলিয়ন ডলার (~২.১% GDP), তেলের রাজস্বের ৫১% বরাদ্দ আছে IRGC-সহলো কমান্ডে

লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেন হুতি ও সিরিয়ার মিলিশিয়ারা থেকে বড় স্বরূপ নিজেদের প্রভাব রেখেছে ।

৫. কঠোর নিষেধাজ্ঞার সত্ত্বেও টিকে থাকার শিল্প
শিল্প ও উৎপাদন খাত ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’র অধীনে টিকে আছে, যদিও অবকাঠামো সংকট বয়ে আয়েছে ।

বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থায়ন এবং চোরাচালান পথ দিয়ে বিদেশি যন্ত্রাংশ সংগ্রহ চালু রয়েছে ।

৬. স্বল্পমেয়াদি তাত্ত্বিক হামলা ও প্রতিরক্ষা
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ইরানের দুটি গ্যাস ও তেল ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, এ সময় দক্ষেপ লক্ষ লক্ষ বিদেশি ক্রুড তেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

ইরান এখনও পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছে, এবং বিশেষ করে স্ট্রেইট অফ হরমুজে সামুদ্রিক ট্রাফিক বিস্তার ও হুমকি দিয়েও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া তীব্রভাবে শুরু করেছে ।

৭. তেলের রাজস্বের গোপন নেটওয়ার্ক – Ghost Fleet
ইরান প্রতিরোধ সূত্র হিসেবে সক্রিয় রেখেছে “ghost fleet” — প্রায় ৩০০+ ট্যাংকার, AIS বন্ধ, নকল রেজিস্ট্রেশন ও ship-to-ship ট্রান্সফার, যা নিষেধাজ্ঞা অতিক্রম করে তেল রপ্তানিতে অবিরত রাখছে ।

২০২৩ সালে গড় দৈনিক রপ্তানি ছিল ১.৪–১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল, যার ৮০–৯০% ব্যবহৃত হয়েছে চীনের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দী করে প্রায় ৪৮টি ট্যাংকার, কিন্তু বছরভর ইরানের শিপ ফ্লিট বড়ই শক্তিশালী হয়েছে ।

৮. ঋণাত্মক নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় ‘রেজিস্টেন্স ইকোনমি ’
আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বারস্থভাবে ২০০৭ সাল থেকে চালু “রেজিস্টেন্স ইকোনমি ” মন্ত্র, যা স্থানীয় উৎপাদন, স্মল স্কেল রপ্তানি, বন্ধু দেশদ্বার আন্তর্জাতিক ব্যাবসা ও barter-বিনিময় জাতীয় উদ্যোগ বৃদ্ধি করে

 

কৃষিপণ্য (গম, কমলা, আপেল, জাফরান), কার্পেট, সিমেন্ট, সার, রাসায়নিক পণ্য ইত্যাদির রপ্তানিতে তীব্রতা রয়েছে ।

৯. প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী ইরান পৃথিবীতে তৃতীয় বৃহত্তম ক্রুড তেল ও দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদকারী দেশ ।
তেল ও গ্যাস খাতে ইরানের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও কিছু সময় ইরান থেকে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনেছে। এক দশক নিষেধাজ্ঞার পর ২০২০ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এমন কিছু ক্রয় তথ্য আমেরিকান কর্তৃপক্ষই প্রকাশ করেছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বসরবরাহের ২০–৩০% তেল যায়, যা ইরানের প্রতিরোধের একটি গ্লোবাল সংগ্রহশালা ।

১০. অর্থনীতি এবং সামাজিক সংকট
মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন—রিয়াল ডলারের বিপরীতে প্রায় ৫০০,০০০–৬৮০,০০০ রিয়াল ।

মূল্যস্ফীতি ৪০–৫০%: গ্যাস, খাঁটা খাদ্যসহ জীবনযাত্রা বিপন্ন ।

বিদ্যুৎ ও পানির ঘাটতি: শিল্প ও জনজীবনে প্রভাব পড়ছে ।

প্রতিবাদ, শিক্ষার্থীদের স্লিপ-আউট এবং নিরাসক্তিশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

১১. সামরিক ব্যয় ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ
প্রতিবছর সামরিক বাজেট দাঁড়িয়েছে ১০.৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২–৩% GDP) ।

প্রযুক্তি ক্রয় (রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া) ও চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা খাতে উন্নয়ন নির্বিঘ্ন চালাচ্ছে ।

সামরিক শক্তি

ইরানের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। যদিও দেশটির সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন বা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার শুরুটা হয়েছিল রেজা খান বা রেজা শাহ পাহলভির হাত ধরে ১৯২০–এর দশকে। তিনি সেনা কমান্ডার থেকে পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী ও রাজা হয়েছিলেন। সামরিক বাহিনীর কমান্ডার হওয়ার পর তিনি আরতেশ বাহিনী গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর সূচনা হয়। তিনি ইরানকে আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। সে জন্য তিনি হাজার হাজার অফিসারকে বিদেশে সামরিক একাডেমিতে পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি নিজ দেশের বাহিনীর সম্প্রসারণ করেন এবং তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পশ্চিমা অফিসারও নিয়োগ দেন (সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট)।

বর্তমান সংকট এবং চ্যালেঞ্জ
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা পতন: রিয়াল হারিয়েছে ৫০%-র বেশি, মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৪০–৪৫% ।

বিদ্যুৎ–জল সংকট ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত: বার্ণের সমস্যা ও উৎপাদন পিছিয়ে পড়েছে বিশ্বমান থেকে ।

অর্থনৈতিক উৎপাদন সংকুচিত: IMF পূর্বাভাসে ২০২৫ সালে GDP প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৩%, নিষেধাজ্ঞার চাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে

সংক্ষেপে
ইরান প্রতিরোধমূলকভাবে যুদ্ধ চালাতে সক্ষম হয়েছে তার প্রাকৃতিক সম্পদ, বিকল্প প্রণালী ও স্বনির্ভর প্রযুক্তি ভিত্তির ওপর। তবে অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়, সর্বোচ্চ খাদ্য–জল–বিদ্যুৎ সংকট এবং ব্যয়সঙ্কুল অর্থনীতির কারণে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ।সিমেন্ট, সার, রাসায়নিক পদার্থ, নির্মাণসামগ্রী, লৌহ-ধাতব পণ্য, টেক্সটাইল ও অস্ত্র রপ্তানিতেও আছে ইরানের সক্রিয় উপস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এসব খাতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে—বলছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার। বাংলাদেশের বাজারেও ইরানি আতর, রত্নপাথর কিংবা বিখ্যাত জাফরান নিয়মিত।সংকট আরও তীব্র হলে ইরানের দীর্ঘদিনের এই টিকে থাকার কৌশল কতটা কার্যকর হয়, তা হয়তো নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর।

এন এ এন টিভি