পাটের পর চা শিল্প থেকে একসময় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো দেশে। এজন্য
উৎপাদন বাড়াতে বৃহদায়তন বাগানের পাশাপাশি সমতল ক্ষুদ্রায়তনেও চা আবাদে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে সরকার।
ফলে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সমতলে চা আবাদে বিপ্লব ঘটেছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও অধিকাংশই চলে যায়
অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে।
জানা গেছে, চলতি বছরের শেষ ছয় মাসেই কমে গেছে প্রায় ২ কোটি টাকার চা রপ্তানি। ফলে চলতি বছরের
শেষের দিকে এসেও চা রপ্তানি খাতে মিলছে না সুখবর। বিদেশি মার্কেট না ধরা ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে রপ্তানি
খাত প্রসারিত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের পাশাপাশি পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলায় চা আবাদ সম্প্রসারিত
হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য জেলা বান্দরবানেও চা আবাদ শুরু হয়েছে। ফলে চায়ের আবাদও আগের তুলনায়
বেড়েছে। তবুও চা রপ্তানি বাড়াতে নানা পরিকল্পনার কথা বললেও এ বছরও কোন সুফল দেখা যায়নি।
ছয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ১৩ গ্রেডের চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। গতবছরের
শেষ ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিশ্বের সাত দেশে ৮ কোটি ১৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকার চা রপ্তাানি হয়েছিল।
আর চলতি বছরের একই সময়ে নয় দেশে ৬ কোটি ২৮ লাখ ৬১ হাজার ২৩৮ টাকার চা রপ্তানি হয়েছে। ফলে
গতবছরের তুলনায় চলতি বছর ১ কোটি ৮৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকার চা রপ্তানি কমে গেছে।
চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের শেষ ছয় মাসে পাকিস্তান, ফ্রান্স, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র,
জাপান, মালয়েশিয়া, সোলোমোন আইল্যান্ডে চা রপ্তানি করা হয়েছিল। আর চলতি বছরের একই সময়ে পাকিস্তান,
হংকং, লেবানন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, পোল্যান্ড ও ব্রুণাইয়ে যায় বাংলাদেশি চা।
চলতি বছর দ্য কনসোলিডটেড টি ল্যান্ডস কোং, আবুল খায়র কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, সিটি টি এস্টেট লিমিটেড,
ইস্পাহানি টি লিমিটেড, কাজী এন্ড কাজী টি, হালদা ভ্যালী ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের মাধ্যমে চা বিশ্বের
নয়টি দেশে রপ্তানি হয়। প্রতি কেজি বিওপি গ্রেডের চা কেজিপ্রতি ৪০৪ টাকা, টি ব্যাগ ৫৫৭ টাকা, ব্ল্যাক টি ১৮৫
টাকা দরে রপ্তানি করা হয়।
চলতি বছরের জুলাই মাসে চা রপ্তানি হয়নি। তবে আগস্ট মাসে পাকিস্তানে ২১শ কার্টনে ৯ হাজার ৫২৫ কেজি চা
রপ্তানি করে ৪৫ লাখ ৬৭ হাজার ৯০৪ টাকা, সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ড, ব্রুণাই, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব
আমিরাতে ৮৮ হাজার ১০৭ কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয় ২ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৪ টাকা। এদিকে
অক্টোবরে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ হাজার ৬৮০ কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয় ১ কোটি ৯ লাখ ৪৫ হাজার
৭২১ টাকা। পাশাপাশি নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৩ হাজার ৯১০ কেজি চা রপ্তানিতে ১ কোটি ৭৭ লাখ
৭৭ হাজার ৭৪৮ টাকা এবং ডিসেম্বরে পাকিস্তান, হংকং, লেবানন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে
১৯ হাজার ৬৬২ কেজি চা রপ্তানি করে আয় আসে ৬৫ লাখ ৯০ হাজার ৫১৫ টাকা।
অপরদিকে গতবছরের জুলাই মাসে পাকিস্তানে ১০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে ৪১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, আগস্ট
মাসে ফ্রান্স, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রে ৯১ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে ১ কোটি ৪৪ লাখ
২৬ হাজার টাকা আয় হয়। সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে ৭৫ লাখ ৮ হাজার
ও অক্টোবরে জাপান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, সোলোমোন আইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে ৩৪ হাজার কেজি চা রপ্তানি
করে ১ কোটি ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা আয় আসে। পাশাপাশি নভেম্বরে ফ্রান্স, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব
আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ২০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে ২ কোটি ৭০ লাখ ৬৫ হাজার এবং ডিসেম্বরে
পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে ৩৬ হাজার কেজি চা বিক্রি করে আয় আসে ১ কোটি ৪০ লাখ ৬ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নঈম উদ্দিন হাছান আওরঙ্গজেব চৌধুরী
সিভয়েসকে বলেন, গুণগতমানের চা উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলায় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এছাড়া চায়ের
বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি, বিপণন প্রক্রিয়ায় আধুনিকায়ন এবং সর্বোপরি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক
বাজারে বাংলাদেশি চায়ের নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলেই চায়ের রপ্তানি বাড়বে।
চট্টগ্রাম চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম (এনডিসি পিএসসি) সিভয়েসকে বলেন,
রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আমাদের নানা উদ্যোগ রয়েছে। প্রথমত আমাদের চায়ের কোয়ালিটি বাড়াতে হবে।
সেদিকে আমরা নজর দিচ্ছি। পাশাপাশি আমরা নিজেরাও বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করছি যাতে চায়ের রপ্তানি
বাড়াতে পারি। ইংল্যান্ডে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কেটিং কোম্পানি লন্ডন টি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ
করেছি। তাদের একটি প্রতিনিধি দলও এসেছিল। এখন সেখানে চা রপ্তানি হচ্ছে। চায়ের কোয়ালিটি বাড়ানোর
জন্য আমরা কোয়ালিটি এন্ড টেস্টিং কোড চালু করেছি। দিন দিন যেহেতু চায়ের উৎপাদন বাড়ছে। আমরা আশা
করছি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে সামনে আরো বেশি রপ্তানি করতে পারবো।
