মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চামড়ার দাম নিয়ে

দেশের বিভিন্ন আড়তে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

লোকসানে বিক্রির দাবি অনেকের। ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া থাকায় পুঁজির অভাবে চামড়া কিনতে না পারার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

ঈদের পর থেকেই জমজমাট কাঁচা চামড়ার বাজার। তবে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম আগে থেকেই সরকার নির্ধারণ করে দিলেও তা কার্যকর হতে দেখা যায়নি।

বিক্রেতাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্য না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

যশোর
যশোরের রাজারহাট। দেশের বৃহত্তম চামড়ার মোকাম। ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে চামড়ার ব্যাপক আমদানি হয়েছে। বেচাকেনাও জমজমাট।

সরেজমিনে চামড়ার মোকাম ঘুরে দেখা যায়, যশোরসহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা হাটে চামড়া নিয়ে এসেছেন।

ছাগল ও গরুর চামড়া পৃথক করে স্তূপ করে রেখেছেন তারা। পছন্দ অনুযায়ী চামড়া ক্রয় করছেন স্থানীয় ও বাইরের আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

তবে চামড়ার বাজার দরে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, গ্রামগঞ্জ থেকে কেনা চামড়া সংরক্ষণে লবণ খরচ বেড়েছে।

ক্রয় মূল্য ও লবণ খরচ যোগ করে একটি চামড়ার যে দাম দাঁড়িয়েছে; সেই দামে বিক্রি করতে পারছেন তারা।

হাটে এ দিন ছাগলের চামড়া প্রতি পিস ১০টাকা থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়েছে। আর গরুর চামড়া ৪০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি, লবণ ও শ্রমিক খরচ বাড়তি হওয়ায় অনেকের পুঁজি বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, গরুর চামড়া বিক্রি করে প্রতি পিসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে।

আর ছাগলের চামড়ার দাম একেবারেই নেই। এতে লবণের দামও উঠবে না।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেন, গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে চামড়ার বেচাকেনা হচ্ছে। তবে মানসম্পন্ন চামড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

আর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন,

এই খাতের উন্নয়ন করতে হলে মৌসুমি ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

জয়পুরহাট
৩৫ কোটি টাকা বকেয়ার বোঝা মাথায় নিয়ে এবার ঈদে চামড়া কিনে বেকায়দায় পড়েছেন জয়পুরহাটের ব্যবসায়ারী।

ট্যানারি মালিকরা এখনো চামড়া সংগ্রহ না করায় লোকসানের আশংকায় তারা।

ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের দিন চামড়ার কিছুটা দাম পেলেও ২য় ও ৩য় দিন গরু, ছাগল ও ভেড়ার কোনটির দামই পাচ্ছেন না।

তাই এই দু’দিন বিভিন্ন আড়তে বিনামূল্যে কিংবা একেবারেই স্বল্প মূল্যে চামড়া দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

নাঈম নামে এক চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, লবণজাত করে চামড়া সংরক্ষণ করে রাখলেও কোনো ট্যানারি মালিকরা চামড়া নিচ্ছে না। এতে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

নীলফামারী
পুঁজির অভাবে চলতি বছর কোরবানির চামড়া কেনায় তেমন আগ্রহ ছিল না নীলফামারীর সৈয়দপুরে চামড়া ব্যবসায়ীদের।

অথচ ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের তিন কোটি টাকার মতো বকেয়া পড়ে আছে।

বিগত ৫ বছর ধরে এ বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে না। ফলে এখানে চামড়া সংগ্রহে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছেন ঢাকার ট্যানারি মালিকরা।

করোনা শুরুর আগের বছর থেকে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনে ঠিকমতো টাকা পরিশোধ করছেন না।

ফলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলেও সব পুঁজি আটকা পড়েছে ট্যানারি মালিকদের কাছে।

বছরের পর বছর বকেয়া তুলতে না পেরে অনেকে বাপ-দাদার আদি ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন।

বর্তমানে হাতেগোনা ১৩-১৪ জন চামড়া ব্যবসায়ী রয়েছেন এখানে।

শহরের আতিয়ার কলোনি এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মো. সরফরাজ মুন্না বলেন,

‘মূলত ব্যাংক ঋণসহ বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানির চামড়া কেনেন।

এরপর ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করে ব্যাংক ঋণসহ অন্যদের ঋণ পরিশোধ করেন।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে তারা সৈয়দপুরের ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩ কোটি টাকা বকেয়া রেখেছেন।

এদিকে, বিগত দিনের ঋণ ঠিকভাবে পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংকগুলোও নতুন করে ঋণ দিচ্ছে না চামড়া ব্যবসায়ীদের। ফলে মারাত্মক পুঁজি সংকটে পড়েছেন তারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও ট্যানারি মালিকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনতে চান না।’

সৈয়দপুর চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. আজিজুল হক বলেন, ‘গত ৪-৫ বছর ধরে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা আমাদের বকেয়া পরিশোধ করছেন না।

ফলে আমরা ব্যাংক ঋণের টাকাও পরিশোধ করতে পারছি না; ব্যাংকগুলোও আর নতুন করে ঋণ দিতে পারছেন না।

এতে এবারে ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এনএএন টিভি