সহকর্মী কি গোপনে আপনাকে অপছন্দ করেন? নাকি বিষয়টি আপনার নিছকই ধারণা? জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনেকেই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। তবে, কেউ আপনাকে অপছন্দ করেন কি না, তা বোঝা কঠিন। কারণ, মানুষ সাধারণত সরাসরি নিজের অপছন্দের কথা প্রকাশ করেন না।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের আচরণের কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্যের প্রতি অপছন্দের ইঙ্গিত বোঝা যায়। চোখে চোখ না রাখা, শারীরিক ভঙ্গিতে অনাগ্রহ প্রকাশ এবং মুখের অভিব্যক্তিতে অবজ্ঞার আভাস—এসব আচরণ সম্ভাব্য কিছু ইঙ্গিত হতে পারে।
তাহলে কী কী লক্ষণ দেখে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে, চলুন জেনে নেওয়া যাক কয়েকটি লক্ষণ।
১. চোখে চোখ রেখে কথা বলা এড়িয়ে চলেন
কোনো ব্যক্তির দৃষ্টি কোথায় নিবদ্ধ রয়েছে, তা থেকে তাঁর মনোযোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত যাদের আকর্ষণীয়, আগ্রহোদ্দীপক বা সামাজিকভাবে মিশুক মনে করেন, তাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে চোখ রেখে কথা বলেন।
অন্যদিকে, কেউ যদি বারবার দৃষ্টি সরিয়ে নেন, ঘরের অন্যদিকে তাকান কিংবা চোখে চোখ রেখে কথা বলা এড়িয়ে চলেন, তাহলে তা মানসিক দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত হতে পারে।
২. মুখের অভিব্যক্তিতে অবজ্ঞা বা বিরক্তি প্রকাশ
মানুষের মুখের অভিব্যক্তি তার চিন্তা ও অনুভূতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অব্যক্ত সংকেত দিতে পারে। গবেষকদের কাছে বিশেষভাবে আগ্রহের বিষয় হলো অবজ্ঞার অভিব্যক্তি। এটি অনেক সময় ঠোঁটের এক পাশ সামান্য উঁচু হয়ে যাওয়া কিংবা একপাশে বাঁকা হাসির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
অবজ্ঞা কোনো ব্যক্তিকে তুচ্ছ মনে করা, নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা এবং তার কাছ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা প্রকাশ করতে পারে। ফলে এটি কাউকে অপছন্দ করার সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অনেক সময় ঘৃণা বা বিরক্তির প্রকাশও এমন ইঙ্গিত হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করতে পারে। অর্থাৎ, কেউ হয়তো অন্য একজনের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছেন।
৩. আপনার সামনে কম হাসেন
মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হলো হাসি।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাসিমুখের মানুষ সাধারণত সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারে এবং এদের বিশ্বাসযোগ্য এবং বন্ধুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়ে থাকে। হাসি অন্যের প্রতি সদয় মনোভাব এবং ইতিবাচকভাবে মেলামেশার আগ্রহও প্রকাশ করে থাকে।
কেউ যদি অন্যদের সঙ্গে হাসিখুশিভাবে কথা বলেন, কিন্তু আপনার সামনে তুলনামূলকভাবে কম হাসেন, তাহলে আপনার প্রতি তার আন্তরিকতা বা বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব কম হওয়ার ইঙ্গিত এটি।
৪. কথা বলার সময় শরীর অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখেন
শুধু মুখের অভিব্যক্তি নয়, মানুষের শরীর কোন দিকে ফেরানো রয়েছে, তা থেকেও তার আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সাধারণত মানুষ যাদের সঙ্গে কথা বলতে বা মিশতে চান, তাদের দিকে শরীর ফিরিয়ে রাখেন। তবে, শরীর যদি অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা হয়, তখন আগ্রহ কমে যাওয়া বা কথোপকথন থেকে সরে থাকার ইঙ্গিত হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এটি কথা না বলে শারীরিক ভঙ্গির মাধ্যমে মানসিক দূরত্ব প্রকাশের একটি উপায়।
৫. আপনার কাছ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখেন
মানুষ একে অপরের সঙ্গে কতটা দূরত্ব বজায় রাখেন, তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখায় গবেষণা করেছে যাকে ‘প্রক্সেমিকস’ বলা হয়। মানুষের পারস্পরিক দূরত্ব অনেক সময় তাদের সম্পর্কের ধরন সম্পর্কে ধারণা দেয়। মানুষ সাধারণত তাদেরই নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে আসতে দেন যাদের সঙ্গে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
তাই কেউ যদি বারবার আপনার কাছ থেকে দূরে থাকেন বা আপনার কাছাকাছি আসতে না চান, তাহলে তা আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কম রাখার ইঙ্গিত হতে পারে।
৬, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি
কোনো সহকর্মী আপনাকে অপছন্দ করেন কি না, তা বোঝার চেষ্টা করার আগে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনো একটি অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি বা শারীরিক ভঙ্গি দেখেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে কেউ আপনাকে অপছন্দ করছেন।
চোখে চোখ না রাখা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বা কম হাসার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন-ক্লান্তি, লাজুক স্বভাব, স্নায়ুবিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা, উদ্বেগ, অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া কিংবা সাংস্কৃতিক পার্থক্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি লক্ষণ যদি বারবার দেখা যায় এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও একই আচরণ চলতে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
তাই কেউ আপনাকে অপছন্দ করেন কি না, তা বোঝার জন্য একটি নির্দিষ্ট আচরণের ওপর নির্ভর না করে তার আচরণে বারবার দেখা দেওয়া পরিবর্তন ও সামগ্রিক ধরন পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
