রাজনৈতিক ইতিহাসের সমস্ত হিসাব-নিকাশ আর বুথফেরত জরিপকে ভুল প্রমাণিত করে ব্রাজিলের রাজনীতিতে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক মহানাটকীয় উলটপুরাণ! প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে, চরম প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে চতুর্থবারের মতো দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন বামপন্থী কিংবদন্তি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। অথচ মাত্র তিন সপ্তাহ আগের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে চরম ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারোর তাণ্ডবে লুলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রায় অন্ধকারের সাগরে তলিয়ে গিয়েছিল।
কারারুদ্ধ সাবেক প্রেসিডেন্ট জেইর বোলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও প্রথম ধাপের নির্বাচনে ২২ লাখেরও বেশি ভোটে এগিয়ে গিয়ে যখন নিজের বিজয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন, ঠিক তখনই ব্রাজিল দেখল এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। আশি বছর বয়সী রাজনৈতিক চাণক্য লুলা মাত্র ২১ দিনে জনমত ঘুরিয়ে দিয়ে এই ঐতিহাসিক বিপরীতস্রোত তৈরি করলেন, যা ১৯৮৮ সালের সংবিধান গ্রহণের পর ব্রাজিলীয় রাজনীতিতে আগে কখনো কেউ দেখতে পায়নি।
এই নির্বাচনী লড়াই কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ ছিল না; রীতিরীতি ভেঙে ব্রাজিলের রাজপথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। একদিকে ছিল অর্থনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠী, প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত বিচারব্যবস্থার রক্তচক্ষু, অন্যদিকে ছিল জনমানুষের প্রবল প্রতিরোধ। এই দ্বিতীয় ধাপের রক্তগরম প্রচারণায় ব্রাজিলের বামপন্থী শক্তি তাদের সমস্ত সামর্থ্য উজাড় করে মাঠে নেমেছিল। এটি কেবল লুলার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ছিল না, বরং ডানপন্থীদের উত্থান ঠেকানোর জন্য এক মরিয়া গণজাগরণ। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রথম ধাপের বিশাল ব্যবধান মুছে ফেলে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনেন এই বর্ষীয়ান নেতা।
লুলার এই মহানাটকীয় জয় কেবল ব্রাসিলিয়ার ক্ষমতা দখলের গল্প নয়, এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব পুরো বিশ্ব জুড়েই তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে যখন একের পর এক চরম ডানপন্থী শক্তির উত্থান হচ্ছিল, তখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ব্রাজিল সেই জোয়ারকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে রুখে দিল।
পাশাপাশি, এই ফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডানপন্থী প্রভাব বিস্তার এবং আঞ্চলিক হস্তক্ষেত্রের কৌশলে এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই অলৌকিক বিজয়ের পরই শেষ নয়, লুলার আসল কঠিন পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে এখন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই বিজয় অস্বীকার করেছেন পরাজিত ফ্লাভিও বোলসোনারো এবং নিকোলাস ফেরেইরার মতো উগ্র ডানপন্থী নেতারা, দাবি করেছেন ভোট বাতিলের।
অন্যদিকে, নির্বাচনের দিন ভোটারদের যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি এবং আদালতের বিচারকদের দ্বন্দ্বে নতুন করে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ। আগামী বছরের শুরুতেই যখন লুলা শপথ নেবেন, তাকে মুখোমুখি হতে হবে উগ্র মেরুকরণে বিভক্ত এক ব্রাজিলের, যেখানে পার্লামেন্ট ও অধিকাংশ অঙ্গরাজ্য এখনো রক্ষণশীলদের দখলে। অর্থনৈতিক সংকট, আদালতের বিচারিক কেলেঙ্কারী এবং ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপের মধ্যে কীভাবে তিনি নতুন বছরের পথচলা পরিচালনা করবেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
