দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটক। দুর্গোৎসব ঘিরেসনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিমা বিসর্জন, সাপ্তাহিক ছুটি ও ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) -এর টানা ছুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্ধ রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান। এ সুযোগে লাখো পর্যটকের সমাগম হয়েছে খাগড়াছড়িতে। পর্যটকদের আগমনে মুখরিত জেলার সব পর্যটন স্পট।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে নয়নাভিরাম নানান দৃশ্য। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি তৈরির নজরকাড়া হাজারো চিত্র। চারপাশে বিছিয়ে রাখা শুভ্র মেঘের চাদরের নিচে রয়েছে সবুজ বনারাজিতে ঘেরা ঢেউ খেলানো অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়। তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা সড়ক। এর মধ্যে রয়েছে আলুটিলার পর্যটন কেন্দ্র, রিছাং ঝর্ণা, রহস্যময় সড়ঙ্গ, জেলা পরিষদ পার্কের ঝুলন্ত সেতু ও মায়াবিনী লেক। নিরাপত্তার ঘাটতি না থাকায় রাত পর্যন্ত পর্যটকরা ঘুরছেন নির্বিঘ্নে। অতিরিক্ত পর্যটকের ভারে যেমন পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে তেমনি হোটেল-মোটেলেও সিট নেই। ফলে আসার আগে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আসতে হবে। অন্যথায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন হওয়ায় ও পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগ বিস্তৃত হওয়ায় খুশি ভ্রমণ পিসাসুরা।
পুলিশ প্রশাসন জানায়, সদর উপজেলার হর্টিকালচার হ্যারিটেজ পার্ক, আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা, শতবর্ষী য়ংড বৌদ্ধ বিহার, আলুটিলা বৌদ্ধ বিহার, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, দশবল বৌদ্ধ বিহার, চেঙ্গি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা, মাটিরাঙার শতবর্ষী বটগাছ, উপজেলা প্রশাসন লেক, জলপাহাড়, ভগবান টিলা, রিছাং ঝরনা, মহালছড়ির মনারটেক লেক, দেবতার পুকুর, মানিকছড়ির বনলতা অ্যাগ্রো প্রাইভেট, পুরাতন রাজবাড়ি, পানছড়ির অরণ্য কুঠির, মায়াবিনী লেক, রাবার ড্যাম, রামগড়ের কৃত্রিম লেক, চা-বাগান, কলসি মুখ, প্রতিষ্ঠাকালীন বিজিবির ভাস্কর্য, দিঘিনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝরনাসহ শতাধিক পর্যটন স্পট রয়েছে। এসব পর্যটন স্পটে শনিবার থেকে প্রচুর পর্যটক এসেছেন। সব হোটেল-মোটেলে উঠেছেন পর্যটকরা।
হোটেল-মোটেল মালিকরা জানিয়েছেন, ৮ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার এবং সাজেকের সব হোটেল-মোটেল ও কটেজ বুকিং হয়ে গেছে। জেলায় সবমিলিয়ে ১২০ এবং সাজেকে ১১০টি হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলে ৬০-৭০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু পর্যটক এসেছেন লক্ষাধিক। হোটেল-মোটেলে জায়গা না পেয়ে অনেক পর্যটক আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকছেন।
কুমিল্লা থেকে আসা তাজনীন মুন্নি বলেন, ‘খাগড়াছড়ি থেকে একটি গাড়ি নিয়ে একরাত সাজেকে থেকে পরদিন খাগড়াছড়ি আসতে ভাড়া দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। খাবার মানসম্মত না হওয়ার পরও দাম ঢাকা-চট্টগ্রামের চেয়ে বেশি রাখা হচ্ছে। এসব বিষয় প্রশাসন না দেখলে পর্যটকরা আগ্রহ হারাবেন।’
খাগড়াছড়ির হোটেল গ্রিন স্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি কল্যাণ মিত্র বড়ুয়া বলেন, ‘টানা এক সপ্তাহের ছুটিতে খাগড়াছড়ি ও সাজেকে লাখো পর্যটক এসেছেন। গত বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ১০ দিনের জন্য সব হোটেল-মোটেল বুকিং হয়ে গেছে। শুধু হোটেল-মোটেল নয়, খাগড়াছড়ি-সাজেক রুটে চলাচলকারী শতাধিক গাড়িও বুকিং হয়ে গেছে।’
খাবার ও হোটেলের কক্ষ ভাড়া বেশি নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনলাইন বুকিং চালু থাকায় হোটেল ভাড়া বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা নির্ধারিত ভাড়াই রাখছি। তবে জ্বালানির দাম বাড়ায় খাবারের দাম একটু বেড়েছে। তাও পর্যটকদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে আছে।’
পর্যটকদের কাছে ভাড়া বেশি রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটন স্পট পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি। এজন্য কমবেশি সবকিছুর দাম বেড়েছে। শুধু এখানে নয়, সারা দেশের পর্যটন স্পটে বেড়েছে। অন্যান্য পর্যটন জেলার সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যাবে, আমরা বেশি নিচ্ছি না।’
জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘প্রচুর পর্যটক এসেছেন। পর্যটকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে প্রশাসন। হোটেল-মোটেল ও পরিবহন ভাড়া বেশি রাখার ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। এরপরও পর্যটকদের কাছ থেকে কেউ যাতে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে না পারেন সে ব্যাপারে সতর্ক আছি আমরা। এমনকি পর্যটকদের হয়রানির অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Comments are closed.