কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের (ইউপি) মেম্বার হয়েও চা বিক্রি করেন ফরিদা খাতুন (৩৭)।
এ পেশায় থেকেই তিনি দুবার নির্বাচিত হয়েছেন। ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের এ সংরক্ষিত নারী সদস্য সবার কাছেই ব্যাপক জনপ্রিয়।
ইউনিয়নের বশোয়া গ্রামের বাসিন্দা ফরিদা খাতুন বশোয়া বাজার এলাকার একজন দোকানি।
তিনি সকালে ইউনিয়ন পরিষদ আর জনগণের জন্য কাজ করেন; আর বিকেলে দোকানে বসে চা-পান বিক্রি করেন। এতে দিনে তিনি ৪০০-৫০০ টাকা আয় করেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বশোয়া বাজারে ঢুকলে প্রথম দোকানটিই ফরিদা মেম্বারের।
তিনি চা বানাচ্ছেন; আর চা পানের জন্য দোকানের সামনে বাঁশের চরাটে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন অনেকে।
ফরিদার স্বামী অনেকটা ভবঘুরে; আয়-রোজগার নেই। তাই জীবন-জীবিকার তাগিদে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন জীবনযুদ্ধে।
বাজারের পাশে অন্যের একখণ্ড জমিতে খুপড়ি ঘর বানিয়ে শুরু করেন চা বিক্রি, সঙ্গে পানও।
চা-পান বিক্রি করতে করতেই তিনি নির্বাচিত হন সংরক্ষিত নারী সদস্য ( মেম্বর)।
তথ্যগুলো দোকানের সামনে বসে থাকা লোকজনের।
তারা বলেন, সাধারণত চেয়ারম্যান-মেম্বাররা হঠাৎ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও ফরিদা অন্যরকম।
দুদুবার মেম্বার নির্বাচিত হলেও সততার কারণে তার সাদামাটা জীবনে আসেনি তেমন পরিবর্তন।
পরিষদের কাজ কাজ আর দোকানদারির ফাঁকে সময় পেলেই ছুটে যান ভোটারদের দ্বারে দ্বারে।
খবর রাখছেন জনগণের সুখ-দুঃখের। চায়ের দোকানই তার ব্যক্তিগত ও নির্বাচনী কার্যালয়।
সবাই তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারেন। মোটামুটি সবাই তাকে পছন্দ করেন।
ফরিদা মেম্বার বলেন, স্বামী ও এক ছেলে সন্তান নিয়ে তার পরিবার।
পেটের দায়ে প্রায় সাত-আট বছর আগে তিনি শুরু করেছেন চা-পানের দোকান। জনগণ তাকে ভালবাসেন।
মেম্বর হয়েও কেন চা বেচেন – এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সরকার ৩ হাজার ৬শ টাকা ভাতা দেয়।
এ টাকা তার পরিষদে যাওয়া-আসা আর জনগণের পেছনেই খরচ হয়ে যায়।
অভাবে ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতে পারেন না। সংসারের চাল, ডাল, তরকারি ইত্যাদি কেনার জন্য তিনি চা বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফরিদা আরও বলেন, জনগণ তাকে খুব পছন্দ করেন।
দোকানে বসার কারণে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তাদের সুখ-দুঃখের কথা তাকে জানাতে পারেন।
তিনি খুব কাছ থেকে শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা চান কি না – এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পালিতো এটু উপকারই হয়।
পালি আর ছাড়ে দেয় কিডা’ (পেলেতো একটু উপকারই হয়। পেলে আর ছেঢ়ে দেয় কেউ।)
ফরিদা সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা আলতাফ মোল্লা (৭০) বলেন, ‘মেম্বার মানুষ চা বেচে খায়, তা তিনি কোনোদিন দেখেননি।
এ মেম্বার খুব ভাল মনের মানুষ। সকালে রাঁধাবাড়া করে খান, আর সারাদিন এবেলা-সেবেলা ঘুরে বিকেলে দোকান খোলেন।
বশোয়া গ্রামের লিটন প্রামাণিক বলেন, দোকানে বসে তারা খুব সহজেই মেম্বারের কাছে সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারেন। মেম্বার সাধ্যমত মানুষের সাহায্য করেন।
শিমুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস ফরিদা সম্পর্কে বলেন, তিনিসহ তার পরিষদের তিন নারী মেম্বারই খুব গরিব। তিনি পরিষদ থেকে তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন।
ফরিদা খাতুন সম্পর্কে ইউএনও রিপন বিশ্বাস বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও তিনি চা বিক্রি করে সংসার চালান। এতে তিনি খুব গর্বিত এবং তাকে সম্মান করেন।
তার জীবনমান উন্নয়নে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দেন ইউএনও।

Comments are closed.