দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান। ভালবাসার সবচাইতে কাছের মানুষটির দিকে চেয়ে এক নিঃশ্বাসে একটি শক্ত, গভীর, আবেগে মোড়া আলিঙ্গন। ঊল্লাশ আর হইচইয়ের মাঝেও যেন সময়টা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
‘মোরা কেঁদেছি একই দুঃখে, হেসেছি একই সুখে’—বাংলা ব্যান্ড ওয়ারফেজের গানের লাইনটা যেন হুবহু মানিয়ে যায় বিরাট কোহলি আর আনুশকার গল্পে। বিরাট কোহলি কিংবা আনুশকা শর্মার তা শোনার সম্ভাবনা কম। সুদূর ভারত আর হিন্দি ভাষী দুই তারকা বাংলা ব্যান্ডের এই গান শুনবেন না হয়তো পরের দুটি লাইনের জন্যও, ‘কখনো ভাবিনি তুমি চলে যাবে/এভাবে রেখে আমায় একাকী।’
এমন কিছু তো তাঁদের সম্পর্কে ঘটেনি কখনোই। একসঙ্গে তাঁরা হেসেছেন, একসঙ্গে কেঁদেছেন—এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছেন বছরের পর বছর। আইপিএল এসেছে, কোহলি রান করেছেন, কিন্তু শিরোপা জিততে পারেননি। ছকে বাধা ওই নিয়তির সময়গুলোতে বহুবারই ভেঙে পড়েছেন কোহলি। কিন্তু তাঁর পাশ থেকে কখনোই সরে দাঁড়াননি স্ত্রী আনুশকা
১৮ বছর, ২৬৭ ম্যাচ ও ৮৬৬১ রানের বিনিময়ে পাওয়া কোহলির এই ট্রফি। ২০০৯, ২০১১ ও ২০১৬ আইপিএল ফাইনালে উঠেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি বেঙ্গালুরু। কোহলিও ভেবেছিলেন আর বুঝি হবে না! এই একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের হয়ে আইপিএলের শুরু থেকে চেষ্টা তো আর কম করেননি। কিন্তু এবার শেষ পর্যন্ত আরাধ্য ট্রফিটির দেখা পাওয়া, গ্যালারিভর্তি দর্শকদের সামনে সেই ট্রফি উঁচিয়ে ধরা- কোহলির কাছে অসাধারণ এক অনুভূতি।
১৮ বছরের আক্ষেপ দূর করে কোহলি যখন আইপিএল জিতলেন, ছল ছল চোখ সঙ্গী করে আলিঙ্গনে স্ত্রীর প্রতি যেন সেই কৃতজ্ঞতা জানালেন। আনুশকার জন্যও মুহূর্তটা বেশ মূল্যবান। বেঙ্গালুরুতেই বেড়ে উঠেছেন আনুষ্কা, ২০১৪ সাল থেকে দলটিকে সমর্থনও করছেন। অবশেষে দেখেছেন শিরোপা জয়।
বিরাট কোহলি ট্রফি বলেছেন, ‘ক্লান্তিহীনভাবে আনুশকা খেলা দেখতে এসেছে। কঠিন ম্যাচগুলো দেখেছে, অল্পের জন্য আমাদের জিততে না পারাও দেখেছে। আমি যেন খেলে যেতে পারি, এ জন্য আমার জীবনসঙ্গী যে ত্যাগ, নিবেদন ও সমর্থন জুগিয়েছে, এসব আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। যখন আপনি পেশাদার খেলোয়াড় হবেন, শুধু তখন বুঝতে পারবেন কত কিছু পর্দার আড়ালে করতে হয় ও কিসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।’ ভাবিনি এই দিনটা আসবে। শেষ বলটা হওয়ার পরই মন ভরে গেল। এই ট্রফি আমার কাছে অনেক কিছু। দলের জন্য নিজের প্রতিটি শক্তি উজাড় করে দিয়েছি। অবশেষে জিততে পারাটা দারুণ একটা অনুভূতি।”
মাঠে তো বটেই,কোহলি আরও বলেন, ‘আনুশকার সঙ্গে বেঙ্গালুরুর সঙ্গে যোগাযোগও অনেক, এখানেই বেড়ে উঠেছে। তার জন্যও এটা খুব খুব বিশেষ কিছু ।আইপিএলে মাঠের বাইরেও কোহলিকে যেতে হয়েছে অনেক কঠিন মুহূর্তের ভেতর দিয়ে। একই ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে ১৮ বছর খেলছেন। তিনবার ফাইনালে গিয়েও শিরোপা জেতা হয়নি। বহুবার নিশ্চয়ই আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। এবার অবশেষে আরাধ্য সেই ট্রফিটা জিতলেন কোহলি।
শেষ পর্যন্ত কোহলি প্রমাণ করলেন, শুধুই প্রতিভা নয়, লেগে থাকা, আঁকড়ে ধরা, ভালোবেসে পথ চলাই সাফল্যের প্রকৃত মানে। আর সেই চলার পথে যখন পাশে থাকেন একজন ‘আনুশকা’, তখন জয়ের গল্পটা হয়ে ওঠে আরও গা ছমছমে, আরও হৃদয়ছোঁয়া। এই আইপিএল ট্রফি কোহলির ক্যারিয়ারের বহু অর্জনের মাঝে নিঃসন্দেহে এক আবেগময়, পরিপূর্ণ চিহ্ন হয়ে থাকবে- যেখানে জয়ের পাশাপাশি লেখা থাকবে এক সম্পর্কের গল্পও।
