১২ ডিসেম্বর নরসিংদী হানাদারমুক্ত দিবস

১২ডিসেম্বর বাঙালীর অহংকার ও গৌরবের মাস। এখন থেকে ঠিক ৫৩ বছর আগে এ মাসেই অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতাকামী বাঙালীর চুড়ান্ত বিজয়। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধেরপর ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদারদের আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বিজয় লাভ করে। পৃথিবীর মানচিত্রে আতœপ্রকাশ করে বাংলাদেশ নামের নতুন এক দেশ।
১২ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয়েছিল নরসিংদী । ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকবাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে গোটা নরসিংদী পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ দিনটি তাই নরসিংদীবাসীর কাছে অত্যন্ত গৌরবোজ্জল ও স্মরণীয় দিন।

১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক খন্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ওই খন্ড যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর নির্মমতার শিকার হয়ে শহীদ হয়েছেন জেলার ১১৬ জন বীর সন্তান। এর মধ্যে নরসিংদী সদরের ২৭ জন,রায়পুরায় ৩৭ ও বেলাবো উপজেলার ১৬জন, মনোহরদীর ১২, পলাশে ১১, শিবপুরের ১৩ । এ ছাড়া বহু মা-বোনের নীরব আত্মত্যাগের বিনিময়ে নরসিংদী হানাদার মুক্ত হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধে ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত নরসিংদীতেও মুক্তিযোদ্ধারা পিছিয়ে থাকেনি। দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিল জেলার আপামর জনসাধারণ। পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল তারা ।

স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা মার্চ মাস থেকেই সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে পাক বাহিনীর অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়। মুক্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে ৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নরসিংদী পাক হানাদার মুক্ত হয়। নরসিংদীর স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে এ দিনটি আজও স্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে নরসিংদীতে ইপিআর, আনসার ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং এ সময় হাজার হাজার ছাত্র জনতা তাদেরকে স্বাগত জানায়। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে শত শত যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; কিন্তু এ খবর পৌছে যায় পাক বাহিনীর কাছে।
৪এপ্রিল পাক বাহিনীর বোমারু বিমান নরসিংদী শহরে বোমাবর্ষণ শুরু করে, গোটা শহরে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি। বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণে শহীদ হন আবদুল হক ও নারায়ণ চন্দ্র সাহাসহ নাম না জানা আরো আট জন। ২৩ মে তৎকালীন মুসলীম লীগ নেতা মিয়া আবদুল মজিদ মুক্তি সেনাদের গুলিতে নিহত হন। পরে শুরু হয় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও চোরাগুপ্তা হামলা। এর মধ্যে পাক বাহিনী নরসিংদী টেলিফোন ভবনে ঘাঁটি স্থাপন করে। স্থানীয় টাউট, দালাল ও রাজাকারদের যোগসাজশে হানাদার বাহিনীরা প্রতিদিন চালায় ধর্ষণ, নরহত্যা ও লুঠতরাজ।

অন্যদিকে বাংলার স্বাধীনতাকাশী তরুণরা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয় এবং আঘাত হানে শত্রু শিবিরে। নরসিংদী সদর উপজেলায় নেহাব গ্রামের নেভাল সিরাজের নেতৃত্বে হানাদার প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলা হয়। ওই স্থান থেকে সমগ্র জেলায় মুক্তিযোদ্ধারা নিরলস ভাবে তৎপরতা অব্যাহত রাখে। মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা ছিল ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ। নরসিংদীকে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে নেওয়া হলে কামান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন রায়পুরা চরের কৃতি সন্তান বিগ্রেডিয়ার (অব.) এ এনএম নুরুজ্জামান । নরসিংদীকে মুক্ত করতে পাক বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা যে সব স্থানে যুদ্ধে অবর্তীণ হয়েছিলেন, সেগুলো হলো, নরসিংদীর সদর উপজেলার বাঘবাড়ী, পালবাড়ী, আলগী, পাঁচদোনা, পুটিয়া, চলনদীয়া, মনোহরদী উপজেলার হাতিরদীয়া বাজার, রায়পুরা উপজেলার শ্রীরামপুর বাজার, রামনগর, মেথিকান্দা, হাটুভাঙ্গা, বাঙালীনগর, খানাবাড়ী, বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর বেলাব বাজার, বড়িবাড়ী এবং নীলকুঠি।

নরসিংদীর ৬ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান, প্রাক্তন মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, সাবেক সাংসদ প্রয়াত আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া, সাবেক সাংসদ জননেতা আব্দুল আলী মৃধা, সাবেক সাংসদ সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল, সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, প্রয়াত হাজী গয়েছ আলী মাস্টার,প্রয়াত সাংসদ মেজর (অব.) সামসুল হুদা বাচ্চু, সাবেক সাংসদ অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন, নেভাল সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, ফজলুর রহমান ফটিক মাস্টার, আজিজুর রহমান ভুলু, মজনু মৃধা, আব্দুল রাজ্জাক ভূঁইয়া, কাজী হাতেম আলী, প্রয়াত নূরুল ইসলাম কাঞ্চন, আব্দুল বাছেদ চৌধুরী বাচ্চু চেয়ারম্যান, আলী আকবর, মো: আমানুল্লাহ, সিরাজুল হক, তাজুল ইসলাম খান, অধ্যাপক মো: ইউনুছ, আব্দুল মোতালিব পাঠান, মীর এমদাদ, মো. নুরুজ্জামান, আব্দুল লতিফ, হাবিবুল্লাহ বাহার, মনছুর আহম্মেদ, আলী আকবর সরকার, নুরুল ইসলাম গেন্দু, বাবর আলী মাস্টার, আবেদ আহমেদ, আব্দুল হাই, সমশের আলী ভূইয়া, মতিউর রহমান মাস্টার, আব্দুল মান্নান খান, তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, বিজয় চ্যাটার্জী ও সাদেকুর রহমান,নৌ-কমান্ডো এস এম ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ।

মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শহীদ হয়েছেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সরোজ কুমার অধিকারী, ড. সাদত আলী, মো: শহীদুল্লাহ, মো: সামসুজ্জামান ও মো: ফজলুর রহমান। চট্রগ্রামে শহীদ হয়েছেন রায়পুরা মধ্যনগরের কৃতি সন্তান চট্রগ্রাম বন্দর চীফ ইঞ্জিনিয়ার, বুদ্ধিজীবি শহীদ শাসুজ্জামান খোকা। পাঁচদোনার নেহাভ স্কুল মাঠের দক্ষিণপশ্চিম কোনায় নির্মাণ করা ওই এলাকার সব মুক্তিযোদ্ধারদের নাম খচিত স্মৃতিসৌধ। মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন খেতাব ভূষিত হয়েছেন নরসিংদীর ৮ জন। তারা হলেন ফ্লাইট লে. শহীদ মতিউর রহমান (বীরশ্রেষ্ঠ), বিগ্রেডিয়ার (অব.) এএনএম নুরুজ্জামান (বীর উত্তম), লে. কর্নেল আব্দুর রউফ (বীর বিক্রম), সুবেদার খন্দকার মতিউর রহমান (বীর বিক্রম), মোঃ শাহাবুদ্দিন (বীর বিক্রম), নেভাল সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ (বীরপ্রতিক),সাবেক এমপি লে. কর্ণেল (অব.) মো: নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতিক) ও হাবিলদার মোঃ মোবারক হোসেন (বীরপ্রতিক)।

জেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সমুন্নত রাখতে স্বাধীনতার ৩৪ বছর পর ২০০৫ সালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিফলক নির্মিত হয়। তবে নরসিংদী শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো শহীদদের নামে নামকরণ করার কথা থাকলেও তা আজও কার্যকর করা হয়নি। রায়পুরায় রামনগরে বীরশ্রেষ্ট মতিউর রহমান জাদুঘর নির্মান করা হয়েছে।

রায়পুরার আলীনগরের কৃতি সন্তান স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত একে এম বজলুর রহমান (টুক্কু) এর নামে তোরণ নির্মান করা হয়েছে। যুদ্ধচলাকালিন ভারতে যেতে টেনিং এর জন্য সহায়তা করে লংঘরখানা খুলে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধের সংগঠক সাইদুর রহমান ছন্দু মিয়া তার নামে রায়পুরা বাঁশগাড়ীতে তোরণ নির্মান করা হয়েছে। বীরমুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক খান মকুল ব্যক্তিগত অর্থ্যায়নে নিজ উদ্যোগে বীরমুক্তিযোদ্ধাদের নামে নান্দনিক ফলক নির্মান করেন। রায়পুরা খানা বাড়ীতে বুলেট ফলক নির্মান করা হয়েছে।

এনএএন টিভি / বশির আহম্মদ মোল্লা