দুই হাজারের বেশি যাত্রী নিয়ে ১৯১২ সালে ডুবে যায় সে সময়ের সবচেয়ে বড় জাহাজ টাইটানিক। ১০০ বছর পরও এটি নিয়ে যেন আগ্রহের কমতি নেই মানুষের।
অবশেষে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষের পাশেই পাওয়া গেল টাইটান সাবমেরিনের ধ্বংসস্তূপ।
৪ দিন মহাসাগরের তলদেশে ব্যাপক তল্লাশির পর বৃহস্পতিবার উদ্ধারকারীরা ডুবোজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা জানান। সমুদ্র পর্যটনে এই সাবমেরিন পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওশানগেট। বৃহস্পতিবার প্রথম প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাঁচ আরোহীর মৃত্যুর কথা জানানো হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের আশপাশে আরও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। সেগুলোর মধ্যে টাইটান সাবমেরিনের বড় পাঁচটি টুকরার সন্ধান পাওয়া গেছে। সাবমেরিনটি বিস্ফোরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কখন সেটি বিস্ফোরিত হয়েছে, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে সাবমেরিনের পাঁচ আরোহীর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। আরোহীদের মরদেহ উদ্ধার করা যাবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি উদ্ধারকারীরা। একইসঙ্গে পাঁচ আরোহীর সম্পর্কে যেসব তথ্য জানা গেছে।
শাহজাদা দাউদ ও সুলেমান দাউদ
টাইটানে ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী শাহজাদা দাউদ। তিনি পাকিস্তানের একটি ধনী পরিবারের সদস্য। ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতিষ্ঠিত দুটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সেবাকাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। তার ছেলে সুলেমান দাউদও ওই সাবমেরিনে ছিলেন। ১৯ বছর বয়সী সুলেমান শিক্ষার্থী।
শাহজাদা দাউদের স্ত্রীর নাম ক্রিস্টিন। তিনি আরেক সন্তান আলিনার সঙ্গে লন্ডনে থাকেন। শাহজাদা পাকিস্তানি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এনগ্রো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি এসইটিআই নামের একটি ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক গবেষণা সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন।
সাবমেরিনটি নিখোঁজ হওয়ার পর শাহজাদার পরিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক জায়গা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাকিংহামে পড়াশোনা করেছেন।
হ্যামিশ হার্ডিং
৫৮ বছর বয়সী হ্যামিশ হার্ডিং একজন ব্রিটিশ অভিযাত্রী। বেশ কয়েকবার দক্ষিণ মেরু ঘুরে এসেছেন তিনি।
আমেরিকান ধনকুবের জেফ বেজোসের যাত্রীবাহী মহাকাশযান ব্লু অরিজিনে চড়ে ২০২২ সালে মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন হ্যামিশ হার্ডিং। তার নামের পাশে তিনটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রেকর্ডটি হলো- পৃথিবীর গভীরতম স্থান হিসেবে পরিচিত মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ডুব দিয়ে সবচেয়ে বেশি সময় থাকা।
হ্যামিশ হার্ডিংয়ের বেড়ে ওঠা হংকংয়ে। আশির দশকে ক্যামব্রিজে পড়াশোনা করার সময় তিনি বিমান চালনায় দক্ষতা অর্জন করেন। ব্যাংকিং সফটওয়্যারে অর্থ উপার্জন করে নিজের বিমান তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
পল অঁরি নাজোলে
৭৭ বছর বয়সী পল অঁরি নাজোলে ফরাসি নৌবাহিনীর সাবেক ডুবুরি। তিনি মি. টাইটানিক নামে পরিচিত। টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের কাছে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন নাজোলে।
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার দুই বছরের মাথায় ১৯৮৭ সালে প্রথম অভিযানে গিয়েছিলেন পল অঁরি নাজোলে। টাইটানিকের অনেক ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বেশির ভাগের উদ্ধারকাজই তিনি তদারক করেন।
পল অঁরি নাজোলের অধীন টাইটানিকের ‘বিগ পিস’ খ্যাত ২০ টন ওজনের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়েছিল।
স্টকটন রাশ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাবমেরিন সরবরাহকারী কোম্পানি ওশানগেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টকটন রাশ (৬১)। তিনি সাবমেরিন টাইটান চালাচ্ছিলেন।
গ্রাহকদের গভীর সমুদ্রের অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য ২০০৯ সালে ওশানগেট প্রতিষ্ঠা করেন স্টকটন রাশ। টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখানোর প্রস্তাব দিয়ে ২০২১ সালে প্রচারিত বিজ্ঞাপন বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিল।
স্টকটন রাশ ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহাকাশ প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি নেন। স্নাতক শেষ করার পর ম্যাকডোনেল ডগলাস করপোরেশনে ফ্লাইট টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে চলে যান স্টকটন রাশ। ১৯৮৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া (বার্কলে) থেকে এমবিএ ডিগ্রি নেন।
৬১ বছর বয়সী রাশ বলেছিলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন আকাশের চেয়ে সমুদ্র মানুষকে বেঁচে থাকার সেরা সুযোগ দেয়। তিনি আরও বলেন, মানবজাতির ভবিষ্যৎ পানির নিচে, মঙ্গল গ্রহে নয়।
