চুয়াডাঙ্গায় ভেজাল ছত্রাকনাশকে কৃষকদের দাবি কোটি টাকার ক্ষতি

আর মাত্র এক মাস পরই ওঠার কথা ছিল পেঁয়াজ। আশা ছিল ভালো দাম মিলবে। সেই টাকায় শোধ করবেন এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে নেয়া সুদের ঋণ। কিন্তু কৃষকের সে আশা পরিণত হয়েছে হতাশায়। খেতে ভেজাল ছত্রাকনাশক স্প্রে করে মাঠেই পচে গেছে পেঁয়াজ গাছ। এমন ক্ষতির শিকার হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের কৃষক। তারা জানিয়েছেন, ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার মতো।

ক্ষতিগ্রস্ত খেতে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজ গাছ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তাতে পচন ধরেছে। কোনো কোনো চাষী পেঁয়াজ খেতে সাথি ফসল হিসেবে মুখিকচু চাষ করেছিলেন। পেঁয়াজের সঙ্গে তাও নষ্ট হয়ে গেছে। চাষীরা জানান, তারা খেতে মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ উৎপাদিত ‘য়োকরাল’ ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছিলেন। এতেই তাদের এমন ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে।

তারা জানান, পেঁয়াজ চাষে তাদের বিঘাপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। ফলন হওয়ার কথা প্রতি বিঘায় ১৬০ মণ। সব ঠিক থাকলে প্রতি বিঘায় তাদের ২-৩ লাখ টাকার পেঁয়াজ উৎপাদন হতো। কিন্তু ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

দামুড়হুদা উপজেলার জাহাজপোতা গ্রামের পেঁয়াজচাষী সেলিম জানান, তিনি আড়াই লাখ টাকার গরু বিক্রি করে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। পেঁয়াজ ও সঙ্গে সাথি ফসল মুখিকচু পুড়ে যাওয়ায় তার ৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সাড়ে তিন বিঘা পেঁয়াজের জমিতে ‘য়োকরাল’ ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। এখন মহাজন ও এনজিওর ঋণের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না।

তিনি আরো জানান, পার্শ্ববর্তী হরিরামপুর গ্রামের আরিফুলের দোকান থেকে তিনি ছত্রাকনাশক কিনে খেতে ব্যবহার করেছিলেন। মার্শাল কোম্পনির লোক ক্ষতিগ্রস্ত পেঁয়াজখেত দেখে গেছেন। ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা থাকলেও না নিয়ে কালক্ষেপণ করছেন। ক্ষতিপূরণ না পেলে দেনার দায়ে পথে বসতে হবে।

জাহাজপোতা গ্রামের ফয়সালের স্ত্রী রেবেকা রুনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাদের আড়াই লাখ টাকা দামের গরু বিক্রি করে দেড় বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা হয়। হুদাপাড়া গ্রামের সারের দোকানদার ইমরানের কাছ থেকে কেনা ‘য়োকরাল’ ছত্রাকনাশক খেতে দিয়ে তাদের সব পেঁয়াজ পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।
সরজমিনে দেখা যায়, হুদাপাড়া গ্রামের লিটনের ১৬ কাঠা, কালু কয়ালের ১০ কাঠা, খোকনের এক বিঘা, সাগরের ১২ কাঠা, খোকনের ১০ কাঠা, জাহাজপোতা গ্রামের ফয়সালের ২৫ কাঠা, মহত আলীর দেড় বিঘা ও আব্দুর রাজ্জাকের দেড় বিঘা, শরিফ উদ্দিনের দুই বিঘা, হরিরামপুর গ্রামের সব্দারের দুই বিঘা, জমিরুলের ১০ কাঠা, মুন্সীপুর গ্রামের নাজমুলের ২৫ কাঠা, সিরাজের ২৫ কাঠাসহ ওই এলাকার বিভিন্ন কৃষকের পেঁয়াজক্ষেত পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

হুদাপাড়া গ্রামের পেঁয়াজচাষী মহত আলী বলেন, ভারতীয় সুখসাগর জাতের পেঁয়াজবীজ এনে প্রতি বছর সীমান্তবর্তী এ গ্রামগুলোয় শত শত বিঘা জমিতে চাষীরা চাষ করেন। কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের বয়রা, হুদাপাড়া, জাহাজপোতা, হরিরামপুর, কুতুবপুর, চন্দ্রবাস, শিবনগর, মুন্সীপুর, আটকবর ও কানাইডাঙ্গা গ্রামের পেঁয়াজচাষীরা এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলা ও জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের অবশ্যই মাঠ পর্যায়ে এসে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সেই সঙ্গে কোম্পানি শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে যাতে দায়মুক্তি না পায়। চাষীদের সঙ্গে প্রতারণা করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কারণ এ উৎপাদন বিপর্যয়ে শুধু এ এলাকার নয়, গোটা দেশের ক্ষতি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুচরা ছত্রাকনাশক বিক্রেতা আরিফুল বলেন, অভিযুক্ত কোম্পানির ডিলার কার্পাসডাঙ্গা বাজারের ব্রিজ মোড়ের কীটনাশক বিক্রেতা হাসিবুর। শুনেছি এলাকায় আরো অনেক চাষী ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কোম্পানি তালিকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ব্যাপারে ডিলার হাসিবুরের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু জানি না। কোম্পানির লোক সব বলতে পারবে। বড় অফিসাররা এটা দেখছেন।

কোম্পনির ফিল্ড অফিসার আরিফুলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমরা মাঠে তদন্ত করে একটা তালিকা করেছি। ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া এ ক্ষতি আমাদের ছত্রাকনাশকে হয়েছে কিনা তার পরীক্ষা চলছে। আমাদের ছত্রাকনাশকে ক্ষতি হলে আমরা দেখব।

এ ব্যাপারে দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমরা শুনে সরজমিন ক্ষতিগ্রস্ত মাঠ পরিদর্শন করেছি। অভিযুক্ত ছত্রাকনাশক কোম্পানির কর্মকর্তাদের ডেকে কথা বলেছি। কৃষককে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে বলে তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আশা করি তারা শিগগিরই ক্ষতিপূরণ দেবেন। না দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এনএএন টিভি / শামসুজ্জোহা পলাশ